ভারতীয় বাজারি ছবি প্রদর্শনের বাজারি ছল

তত্ত্ব

কল্লোল মোস্তফা

সম্প্রতি ‘জোর’, ‘সংগ্রাম’ ও ‘বদলা’ নামের তিনটি ভারতীয় বাংলা ছবি বাংলাদেশের প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শনের জন্য সেন্সর বোর্ডের ছাড়পত্র পেয়েছে। এর মধ্যে আগামী ২৩ ডিসেম্বর ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও যশোরের কয়েকটি সিনেমা হলে ‘জোর’ ছবিটি মুক্তি দেওয়া হবে এবং ‘সংগ্রাম’ ও ‘বদলা’ মুক্তি দেওয়া হবে জানুয়ারিতে। এরপর আসবে নয়টি ভারতীয় হিন্দি ছবির পালা। এর আগে গত ২০১০ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ সরকার ভারতীয় ছবি আমদানি ও প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শনের অনুমতি প্রদানের সিদ্ধান্ত নেয় এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আমদানি নীতিমালায় এ বিষয়ক বিধি-নিষেধ তুলে নেয়। কিন্তু দেশীয় চলচ্চিত্রের পরিচালক-প্রযোজক ও শিল্পী কলাকুশলীদের আন্দোলনের মুখে সরকার ভারতীয় ছবি আমদানির ওপর পুনরায় বিধি-নিষেধ আরোপ করে। সরকারের এই নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে আমদানিকারক ও প্রদর্শকরা উচ্চ আদালতে রিট আবেদন জানান। আদালতের নির্দেশে উল্লিখিত সময় যেসব ছবি আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খোলা হয় সেসব ছবিকে চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড ও তথ্য মন্ত্রণালয় অনাপত্তিপত্র দেয়। এই অনাপত্তিপত্রের তালিকায় উল্লিখিত তিনটি ভারতীয় বাংলা ছবি ছাড়াও আছে নয়টি ভারতীয় হিন্দি ছবি। এসবের মধ্যে আছে বলিউডের সুপারহিট ছবি সোলে, দিলওয়ালা দুলহানিয়ালে জায়েঙ্গে, দিল তো পাগল হ্যায়, কুছ কুছ হোতা হ্যায়, কাভি খুশি কাভি গম, ধুম-২, ডন, ওয়ান্টেড ও থ্রি ইডিয়টস।

ভারতীয় চলচ্চিত্র আমদানি ও প্রদর্শনীর পক্ষ নিয়ে একধরনের প্রচারণা গত বছরও হয়েছে, এবারও হচ্ছে যেটাকে সাধারণভাবে নয়া উদারনৈতিক বাজার অর্থনীতির বাজারি উন্নয়ন দর্শন প্রভাবিত বলে শনাক্ত করা যায়। এই প্রচারণাকারীদের মূল বক্তব্য হলো বাংলা চলচ্চিত্রকে চল্লিশ বছর ধরে ‘প্রটেকশন’ দেওয়া হচ্ছে এবং তার ফলাফল ভালো হয়নি। তারা মনে করছেন প্রটেকশন দেওয়ার কারণেই আজকের এই খারাপ অবস্থা। তাদের ভাষায় এর কারণ : ‘বাংলাদেশী ছবির প্রযোজকরা জানেন, তারা যা তৈরি করবেন দর্শকদের তাই দেখতে হবে। দর্শকদের হাতে কোনো বিকল্প নেই।’ ফলে তাদের কথা অনুসারে ‘সারভাইবাল অব দ্য ফিটেস্ট’-এর নিয়মে চলচ্চিত্রকে প্রতিযোগিতা করেই টিকতে হবে এবং এভাবে প্রতিযোগিতার মাধ্যমেই নাকি ছবি ভালো হবে। তারা আরো মনে করেন, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে চলচ্চিত্র আমদানি আইন করে বন্ধ করে রাখা যায় না, এটা নাকি ভন্ডামি!

এখন প্রশ্ন হলো, আসলেই কি দর্শকের হাতে কি কোনো বিকল্প নেই কিংবা আসলেই কি বাংলা ছবিকে দীর্ঘসময় ধরে প্রটেকশন দেওয়া হয়েছে? এবং এ প্রটেকশনের কারণেই বাংলাছবির এই খারাপ অবস্থা? আসলেই কি উপযুক্ত প্রতিযোগিতার মুখে পড়লে ঢালিউডের বাংলাছবির মানোন্নয়ন হয়ে যাবে? আসলেই কি বাজার অর্থনীতিতে সবকিছু উন্মুক্ত থাকে, বাজারের অদৃশ্য হাতের জাদুতে চলে?

প্রথমত, ধরা যাক, প্রটেকশন বা প্রতিযোগিতাহীনতাই সব সমস্যার মূল। সেক্ষেত্রে প্রশ্ন তুলতে হয়, স্বাধীনতার পরের ৪০ বছরজুড়ে কি চলচ্চিত্র নিরঙ্কুশ প্রতিযোগিতাহীন ছিল? বিগত দুই দশকে স্যাটেলাইট চ্যানেল, ভিসিপি, ভিসিআর, সিডি, ডিভিডি ইত্যাদির সঙ্গে কি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে প্রতিযোগিতা করতে হয়নি? সে প্রতিযোগিতার ফলাফল কি? বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের শেষ আশ্রয়স্থলটিও ভারতীয় আগ্রাসী বাজারি ছবির হাতে তুলে দিয়ে সেই প্রতিযোগিতা আরো তীব্র করলে কি ফলাফল উল্টে যাবে? নাকি সিনেমা হলের ওপর ভারতীয় বিনোদন ইন্ডাস্ট্রির দখল নিশ্চিত করার মাধ্যমে আসলে বাংলাছবির ধ্বংসস্তূপ থেকে এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের স্বপ্ন-কল্পনা-আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করতে সক্ষম এমন নতুন চলচ্চিত্রের বিকাশের শেষ সম্ভাবনাটুকুও চিরতরে নষ্ট করে দেওয়া হবে? পাঠক, লক্ষ্য করলে দেখবেন, বাংলাদেশের সিনেমার মান দ্রুত গতিতে একটি বিশেষ দিকে মোড় নেয় নববইয়ের দশক থেকে যখন কারিগরি এবং অর্থকরী উভয়দিক দিয়েই ইতোমধ্যেই ভীষণ দুর্বল বাংলা সিনেমাকে হলিউড-বলিউডের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতে হয়েছে। বাংলা সিনেমার ঢাল নাই তলোয়ার নেই। রাষ্ট্র চলচ্চিত্র শিল্পের প্রয়োজনে একটা চলচ্চিত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত গড়ে তুলেনি। কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চলচ্চিত্রের কোনো কোর্স নেই, গবেষণা নেই। চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের কোনো সংস্থান নেই। এ অবস্থাকে কি সংরক্ষণ বলে নাকি বড়জোর বন্দি করে গলাটিপে মেরে ফেলার আয়োজন বলে? ফলে সে সময় বলিউড/হলিউডের ‘নান্দনিক নগ্নতা’ আর ‘সাইফাই ভায়োলেন্সের’ সঙ্গে কি নিয়ে প্রতিযোগিতা করবে ঢালিউড, মোটা দাগের অনুকরণ ছাড়া আর কি-ই বা অবলম্বন তার কাছে ছিল?

দ্বিতীয়ত, আরেকটা বিষয় বেশ ইন্টারেস্টিং। বাংলাদেশের মূল ধারার ছবির বিপরীতে ভারতীয় পণ্য ছবিকে দাঁড় করানোর ক্ষেত্রে ধরেই নেওয়া হচ্ছে বলিউডের পণ্য ছবিগুলো ঢালিউডের চেয়ে ‘উন্নত রুচির’। এবং মুক্তবাজারের হাতে ছেড়ে দিলে এই ‘উন্নত রুচি’র সাংস্কৃতিক পণ্য মধ্যবিত্ত দর্শককে হলমুখী করবে এবং ফলে হল মালিকদেরও একটা গতি হবে এবং চলচ্চিত্র শিল্প ধ্বংস হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পাবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, হলিউড-বলিউড-ঢালিউডের পণ্য ছবির মধ্যে আদৌ কি কোনো পার্থক্য আছে? হলিউড-বলিউড কি খুব জীবন ঘনিষ্ঠ ‘সুস্থধারার’ বিনোদন হাজির করে আর ঢালিউড শুধু ‘নোংরামো’ দেখায়? নাকি হলিউড-বলিউড-ঢালিউড সব একই ফর্মুলায় চলে? ঢালিউডের সঙ্গে হলিউডের/বলিউডের পার্থক্য হলো যৌনতা ও ভায়োলেন্স এরা বেশ সুদৃশ্য মোড়কে সুন্দর কারুকার্য করে হাজির করে আর ঢালিউডের যেহেতু কারিগরি ও অর্থনেতিক সামর্থ্য কম, ঢালিউড সেটা ‘র’ ফর্মে হাজির করে। আর মধ্যবিত্ত ঘরে বসে ছোট পর্দায় হলিউড-বলিউডি সুদৃশ্য মোড়কে পোরা যৌনতা ও ভায়োলেন্স দেখতে দেখতে ইতোমধ্যেই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে, এখন সেটাকে কাজে লাগিয়ে বড় পর্দার বাড়তি উত্তেজনার বাড়তি ব্যবসা চাই। তাই এখন প্রতিযোগিতার ছল।

তৃতীয়ত, মুক্তবাজার অর্থনীতি জিনিসটাই একটা ভন্ডামি কিনা, মুক্তবাজার অর্থনীতিই সবার কাম্য কিনা, মুক্তবাজার অর্থনীতি সব মুশকিলের সমাধান করতে পারে কিনা সে বিতর্কে বিস্তারিত না গিয়েও বলা যায়, মুক্তবাজার তত্ত্বগতভাবে যতটা মুক্ত বাস্তবে কিন্তু ততটা মুক্ত নয়। ভারতীয় সব স্যাটেলাইট চ্যানেল অবাধে বাংলাদেশে প্রদর্শিত হলেও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার দোহাই দেখিয়ে বাংলাদেশের কোনো স্যাটেলাইট চ্যানেলকে ভারতে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। এর সঙ্গে বাংলাদেশী পণ্যের বিজ্ঞাপন ও প্রতিযোগিতা থেকে ভারতীয় পণ্যকে রক্ষা থেকে শুরু করে সাংস্কৃতিক আধিপত্যের প্রশ্নটি যুক্ত। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে তো সাধারণ অর্থে কোনো আমদানি রফতানির ক্ষেত্রে বাধা থাকার কথা না। কিন্তু বাস্তবে মুক্তবাজার অর্থনীতির ধ্বজাধারী সব দেশই তাদের দেশীয় শিল্পের এবং কৃষির স্বার্থে নানান শুল্ক ও অশুল্ক বাধা জারি রাখে। একইভাবে চলচ্চিত্র শিল্পের যদি উন্নতি করতে হয় তাহলে তাকে মুক্তবাজার অর্থনীতির দোহাই পেরে আর্থিক, কারিগরি, নন্দন তাত্ত্বিক সবদিকে থেকেই দুর্বল রাখার সব ম্যাকানিজম বা কৌশল চালু রাখলে চলচ্চিত্রকে আর কোমর শক্ত করে দাঁড়াতে হবে না! হলিউডের যৌনতা-ভায়োলেন্সের নষ্টামির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে ভারতীয় হিন্দি ছবিও কম নষ্ট হয়নি। আর অন্যদিকে ইরানি ছবির দিকে তাকান-সেন্সরশিপসহ নানান কারণেই সেটা আমাদের মডেল না হলেও, একদিকে হলিউডি প্রতিযোগিতা থেকে মুক্ত থাকা এবং অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার ফলে কড়া সেন্সরশিপ সত্ত্বেও যে কোনো বিচারে ইরানি ছবি বিশ্বের অন্যতম সেরা ছবি হয়ে উঠেছে।

চতুর্থত, আমরা সাধারণভাবে বিদেশী ছবি আমদানির বিপক্ষে নই। বরং সারা দুনিয়ার বিভিন্ন দেশের গণমানুষের জীবন ও সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্বকারী ছবি যেন দেশের মানুষ দেখতে পারে সেটাই কাম্য। কিন্তু সেটা এখন যেভাবে বাজারি প্রতিযোগিতার মাধ্যমে করার কথা বলা হচ্ছে তার পক্ষে থাকার জো নেই। কারণ বাজার দেখে মুনাফা, মুনাফার প্রয়োজনে বাজার আধিপত্যবাদী বাজারি ছবিই আমদানি করবে আর তার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে এ দেশের চলচ্চিত্রের পুরো বিলুপ্তি ঘটবে নতুবা আরো অধঃগতি হবে আর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে হিন্দিভাষা আর আধিপত্যবাদী সংস্কৃতির প্রভাব স্যাটেলাইট চ্যানেলের নাটক সিরিয়ালের সীমা ছাড়িয়ে চলচ্চিত্রের মতো একটি শক্তিশালী মাধ্যমেও জাঁকিয়ে বসবে।

শেষকথা হলো, গ্রেফ ভারতীয় ছবি আমদানি ও প্রদর্শন বন্ধ করলেই যেমন চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নতি হবে না, তেমনি ভারতীয় ছবি বাণিজ্যিক ভিত্তিতে প্রদর্শন করলেই ভারতীয় চলচ্চিত্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতার মুখে দেশীয় চলচ্চিত্র উন্নত হয়ে উঠবে না। চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নয়নের জন্য চাই রাষ্ট্রীয় প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ, আর্থিক দায়িত্ব নেওয়া, চলচ্চিত্র শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা এবং দেশের বড় বড় সিনেমা হলে বাধ্যতামূলকভাবে মাসের অন্তত একটি সপ্তাহে ভারতীয় বাজারি ছবি নয় বরং ভারতসহ সারা দুনিয়ার গণমানুষের জীবন ও সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্বকারী সেরা চলচ্চিত্র প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা।

(প্রথম প্রকাশ: অধুনালুপ্ত সাপ্তাহিক বুধবার)

© 2016. www.oncinemabd.com | Editor & Founder Bidhan Rebeiro | oncinemabd@gmail.com | C: www.bidhanrebeiro.wordpress.com