লায়ন অব দ্য ডেজার্ট : জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র

সিনেমা আলোচনা

ফ্লোরা সরকার

ওমর মোক্তারলায়ন অব দ্য ডেজার্ট ছবির শেষ দৃশ্যের আগের দৃশ্যে সামরিক আদালতে অভিযুক্ত ওমর মুখতারকে (ছবির নায়ক) প্রধান বিচারক যখন গুরুগম্ভীর ভাব নিয়ে বলেন, ‘‘তোমার দেশের বৈধ সরকারের বিরুদ্ধে তুমি বিদ্রোহ করার কারণে তোমার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আনয়ন করা হয়েছে’’ – তখন দর্শক একটি তীর্যক হাসি না হেসে পারেন না। কেননা ঔপনিবেশিকতাবাদ সবসময় এই রকম মুখোশ পরে অবৈধভাবে অধিকৃত দেশের বৈধতা দাবি করে থাকে। একদিকে বিচারক বলছেন ‘তোমার দেশ’, অন্যদিকে বলছেন ‘বৈধ সরকার’ – সবটা ছবি দেখার পর এই দুটো শব্দ যে কোনো দর্শকের কানে বিসদৃশ হয়ে বিকট আওয়াজের মতো যেন বেজে ওঠে। কারণ বিচারক যাকে তোমার দেশ বলছেন তা যেমন ওমর মুখতারের দেশ নয় তেমনি যে বৈধ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের অভিযোগ আনা হয়েছে সেই সরকার নিজেই অবৈধ। যে সরকার নিজেই অবৈধ সে যেমন অন্যের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ পেশ করতে পারে না তেমনি অবৈধ সরকারের দেশ কখনোই একটা স্বাধীন দেশ হতে পারে না। উপনিবেশ দখলদারদের কাছে বৈধতা-অবৈধতা, নীতি-নীতিহীনতা, স্বাধীনতা-পরাধীনতার কোনো বিভাজন রেখা নেই। ঔপনিবেশিকতাবাদ জানে শুধু দখল, শোষণ আর সাম্রাজ্যের বিস্তার করতে। সাম্রাজ্যবাদ হচ্ছে তার চরম লক্ষ্য এবং আদর্শ। দখলকৃত দেশটিকে তারা বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি মনে করে। ফলে সেখানকার জনগণকে তাদের জাতিগত পরিচয়, স্বাধীনভাবে বসবাসের কোনো অধিকার বা প্রয়োজনীয়তার দিকে কোনো ধরনের ভ্রূক্ষেপ করা হয় না। বরং কোনো ধরনের প্রতিবাদ বা বিদ্রোহ দেখা দিলেই তাকে সন্ত্রাসবাদী নামে আখ্যায়িত করে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত বা দেশছাড়া করতে বাধ্য করা হয়। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এসব প্রতিবাদ বা বিদ্রোহ যুগে যুগে ঘটেছে। কারণ নিজের দেশটাকে সবাই নিজেদের মতোই ভালোবাসে। নিজের আত্মপরিচয়, নিজেদের জাতিগত পরিচয়, স্বাধীনভাবে চলাফেরা এবং বসবাসের অধিকার প্রত্যেক দেশের প্রত্যেক নাগরিকের একান্তভাবে কাম্য। সেটা যখন ঘটতে দেওয়া হয় না ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে লায়ন অব দ্য ডেজার্টের নায়ক ওমর মুখতারের মতো এক একজন মহানায়কের আবির্ভাব ঘটতে দেখা যায়।

১৯১১ সালের অক্টোবরে ইতালির ঔপনিবেশিক সেনারা লিবিয়ার ত্রিপোলি শহরের সমুদ্রতীরে গিয়ে পৌঁছে। সেই সেনাদলের পদাতিক বাহিনীর নেতা ফারাফেলি লিবীয়দের জানায়, হয় তারা আত্মসমর্পণ করবে ইতালির কাছে নয়তো পুরো শহর গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে। লিবীয়রা পালাতে শুরু করল। তবু ইতালিয়ান সেনারা তিন দিন ধরে অবিরামভাবে শহরটির ওপর বোমা নিক্ষেপ অব্যাহত রাখার পর লিবীয়দের ইতালির সঙ্গে সংযুক্তি হওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকে। ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে এই সময়টিতে লিবিয়ার ওমর মুখতার বাহিনী এবং ইতালির দখলদার বাহিনীর মধ্যে এক ধারাবাহিক যুদ্ধের প্রারম্ভ সময় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। ছবির শুরুতে বাস্তব ফুটেজের মধ্য দিয়ে ধারা বর্ণনায় দর্শকদের ইতালির লিবিয়া দখলের এই ইতিবৃত্তের সংক্ষিপ্তসার দেখানো হয়। ছবির মূল কাহিনী শুরু হয় ১৯২২ সাল থেকে, যখন ইতালিতে ফ্যাসিস্ট বেনিতো মুসোলিনি ইতালির শাসন ক্ষমতায় আছেন। ওমর মুখতার নামে বেদুইন মানুষটি ততদিনে ইতালির শাসকদের কাছে একটি আতঙ্কের নাম হিসেবে ছড়িয়ে গেছে। কারণ ওমর তার প্রিয় মাতৃভূমি থেকে বিদেশী শাসনের অবসানের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে বিভিন্ন খন্ড যুদ্ধে অনেক ইতালিয়ান সেনাবাহিনীকে ধরাশায়ী করেছেন। মুসোলিনি ইতালির আরেক রক্তপিপাসু সেনাপ্রধান জেনারেল রডলফো গ্রেজিয়ানিকে লিবিয়ার গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত করেন ওমরকে শায়েস্তা করার জন্য এবং বলেন, ‘‘গত বিশ বছর ধরে একটা খামোখা যুদ্ধে আমাদের অনেক সময় নষ্ট হয়ে গেছে, পাঁচ পাঁচটা গভর্নর সেখানে নিয়োজিত থেকেও ওমর মুখতারকে দমন করতে পারলো না।। আশা করি তুমি সেই কাজটি করতে পারবে।’’

ওমর মুখতারের প্রথম দৃশ্যে আমরা দেখি ওমর একটি মক্তবে শিশুদের কোরআন পাঠের শিক্ষা দিচ্ছেন। কোরআন পাঠের একটি জায়গায় ভারসাম্যের প্রসঙ্গ এলে ওমর শিশুদের জিজ্ঞেস করেন, ‘‘এখানে ভারসাম্যের কথা কেন এসেছে?’’ উত্তরটি তিনি নিজেই দেন- ‘‘কারণ ভারসাম্য না হলে সবকিছু ধসে যায়।’’ আর তখনই আমরা বুঝতে পারি ভারসাম্যহীন লিবিয়ার ভারসাম্য আনয়নের লক্ষ্যে, অর্থাৎ যার যার দেশ তার তার শাসনের অধিকারকে বোঝানোর লক্ষ্যে কোরআনের এই অংশটি তুলে ধরা হয়েছে। ইতোমধ্যে তার কাছে নতুন জেনারেল গ্রেজিয়ানির নিয়োগের খবর এলে ওমর বলেন, ‘‘এরা সিংহের মতো আসে আর ইঁদুরের মতো চলে যায়।’’ ঠিক পরের দৃশ্যে তুলনামূলক বৈষম্য প্রদর্শনের লক্ষ্যে পরিচালক মোস্তফা আক্কাদ অত্যন্ত মুনসিয়ানার সঙ্গে বেনগাজিতে বল নাচের মনোরম দৃশ্যে জেনারেল গ্রেজিয়ানির অভিষেক অনুষ্ঠান দেখান। ওমরের গ্রাম সেনুসির বিপরীতে বেনগাজি শহরের জাঁকজমকপূর্ণ অভিষেক ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের প্রকৃত এবং কৃত্রিম চিত্র দর্শককে উপনিবেশের নিষ্পেষণের চেহারাটা যেন চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। এর মাঝে জেনারেলের কাছে ওমর বাহিনীর হাতে ইতালি সেনাদের মৃত্যু সংবাদ আসে। তারপরই দেখা যায় একটা শান্ত গ্রাম কীভাবে ইতালীয়দের দ্বারা ধ্বংস আর মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়। এভাবে একের পর এক ধ্বংসযজ্ঞের মধ্য দিয়ে ছবির কাহিনী এগিয়ে যায়। ওমর বাহিনী বীরত্বের সঙ্গে এসব ধ্বংসযজ্ঞ প্রতিরোধের সংগ্রাম করে যান। কোনোভাবেই যখন ওমর এবং তার বাহিনীকে আত্মসমর্পণে সমর্পিত করা যায় না জেনারেলের উদ্যোগে তখন ওমরের সঙ্গে একটা সমঝোতা চুক্তির ব্যবস্থা করা হয়। যে বৈঠকে মেজর তমেলি, বেনগাজির কমিশনারসহ আরো দু’জন উপস্থিত থাকেন। ছবির এই অংশে পরিচালক মোস্তফা ঔপনিবেশিক শাসক এবং উপনিবেশিত মানুষের চিত্র অত্যন্ত স্পষ্ট ও প্রাঞ্জল সংলাপের মধ্য দিয়ে উপস্থাপন করেন। সংলাপের কিছু অংশ এখানে তুলে ধরা হলো-

মেজর : চুক্তির শর্ত আপনারা বলতে পারেন।

ওমর : আমাদের প্রথম শর্ত এখানে মুসলিম স্কুল স্থাপন করতে হবে।

মেজর : অবশ্যই। আমরা শিক্ষার স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। আমরা নিশ্চয়ই স্কুলগুলো আবার খোলার ব্যবস্থা করব।

ওমর : আমাদের জন্য জাতীয় সুরক্ষার প্রয়োজন। সেজন্য আমাদের নিজেদের একটা সংসদ থাকা দরকার।

কমিশনার : সংসদের প্রশ্নটা রোমের বিষয়।

এই সময় ওমরকে উত্তেজিত দেখালে মেজর তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন-

মেজর : তোমার শর্তটা আমি নোট করে রাখলাম। তবে এই দেশের ভূখন্ড বাজেয়াপ্ত ভূমি হিসেবে পরিগণিত হয়ে থাকে।

ওমর : বাজেয়াপ্ত ভূমি আমরা ফেরত চাই।

মেজর : না মানে- বাজেয়াপ্ত বলতে বোঝাতে চেয়েছি এই ভূখন্ডের উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার কথা।

ওমর : উন্নয়ন? কার দ্বারা? ইতালি? শোন – বিশ, চল্লিশ বছর বা তারও বেশি যদি সময় লাগে, জেনে রেখো এই ভূমি একদিন আমাদের হবেই।

কমিশনার : তোমরা কেন এই ভূমির জন্যে যুদ্ধ করছো? তোমাদের কোরআনে যুদ্ধ করার কথা তো নেই।

ওমর মৃদু হেসে জবাব দেয়-

ওমর : তোমরা আমাদের ধর্মের কথা শোনাচ্ছো? আমাদের কোরআনে এমন কথা নেই যে অন্য কেউ আমাদের ভূমি দখল করে রাখবে আর আমরা চুপ করে তাকিয়ে তা দেখবো। যুদ্ধের মাধ্যমে তা অর্জনের কথা বলা হয়েছে।

এভাবে আরও তর্ক চলতে থাকে, এক সময় মেজার তোমেলি ওমরকে মাসিক পঞ্চাশ হাজার লিরা ভাতা হিসেবে এবং ভালো বাড়ি উপহারের কথা জানালে ওমর অত্যন্ত অপমানিত বোধ করেন। মেজর তাকে বলেন-

মেজর : তোমার রিটায়ারমেন্টের কথা ভেবেই এই ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। তোমার আরাম-আয়েসের দিকে চেয়েই বলেছি।

ওমর : আরাম-আয়েস? আমার মানুষকে কষ্টে রেখে আমি কী করে আরামে থাকবো? তোমরা আসলে কখনোই আমাদের শান্তি চাও না। তোমরা যুদ্ধ আর শোষণের বন্ধনে আমাদের বেঁধে রাখতে চাও। কাজেই তোমাদের সঙ্গে কোনো রকম শর্ত বা চুক্তিতে যাওয়া একেবারেই বৃথা।

কথা শেষ করে বীরদর্পে ওমর এবং তার সঙ্গীরা বের হয়ে যায়। বীরের কাহিনী বীরত্বে গাথা থাকে। তাই পাহাড়ে যখন ওমরের বন্ধু তার সঙ্গে দেখা করতে যায় ওমরকে ইতালীয়দের কাছে সমর্পণের পরামর্শ দেওয়ার জন্য, তখনো তার সেই বীরত্ব আমরা দেখতে পাই। বন্ধু তাকে বলে-

বন্ধু : তোমার কারণে লিবীয়রা কনসেনট্রেশান ক্যাম্পে মানবেতর জীবনযাপন করছে। তুমি আত্মসমর্পণ করলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।

ওমর : আমার আত্মসমর্পণের অর্থ তুমি বোঝ? আমার আত্মসমর্পণ মানে এ দেশের মানুষের সফঙ্গ বিশ্বাসঘাতকতা করা।

বন্ধু : তুমি বুঝতে পারছ না ইতালীয়রা এ দেশে শান্তি স্থাপন করতে চায়।

ওমর : কোন ধরনের শান্তি? আমাদের ঘরবাড়ি, ক্ষেতখামার জ্বালিয়ে, হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে ফাঁসীর কাষ্ঠে ঝুলিয়ে, মা-বোনদের শ্লীলতাহানি করে শান্তি স্থাপন করতে চায়? এরকম শান্তির আমার প্রয়োজন নেই।

বন্ধু ব্যর্থ মনোরথ হয়ে ফেরত যায়। ওমরের বীরত্বের সব থেকে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আমরা দেখি তার বন্দি হওয়ার পর তাকে যখন জেনারেল গ্রেজিয়ানির কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। ছবির এই অংশের কিছু সংলাপ তুলে ধরা হলো-

জেনারেল : তুমি কেন তোমার দেশের সর্বনাশ ডেকে আনছো?

ওমর : সর্বনাশ আমরা ডাকিনি। তোমরা ডেকেছো। তোমরা আমাদের ভূখন্ড দখল করেছো। আমরা তোমাদের ভূখন্ড দখল করিনি। এক মুহূর্তের জন্যও তোমাদের কোনো অধিকার নেই আমাদের ভূখন্ড দখলে রাখার।

জেনারেল : অবশ্যই আছে। এবং শুধু ইতালিরই সর্বস্ব অধিকার আছে তোমাদের ভূখন্ডের ওপর। অন্য কারোর নয়। যেমন অধিকার আছে ইংল্যান্ডের ইজিপ্টের ওপর, যেমন আছে ফ্রান্সের তিউনিসিয়ার ওপর, স্পেনের মরক্কোর ওপর। আমাদের একশ’ বছরের দখলদারিত্বের অধিকার আছে এই লিবিয়ার ওপর।

একশ’ বছর বলতে জেনারেল সেই সিজারের সময়ের কথা ওমরকে আবার স্মরণ করিয়ে দেন। জেনারেলের মাত্র একটি সংলাপের মধ্যে দিয়ে পরিচালক আমাদের ঔপনিবেশিক দখলের ভয়াবহ চিত্র এঁকে দেন। ওমর তাদের সভ্যতার প্রশংসা করলে জেনারেল তার কাছে জানতে চান, আর কতদিন লাগবে ওমর এবং তার দলের আত্মসমর্পণ করতে। জবাবে ওমর বলেন- ‘‘আমরা কখনোই আত্মসমর্পণ করব না। আমরা হয় জিতবো না হয় মরবো। এর জন্যে যদি প্রজন্মের পর প্রজন্মের প্রয়োজন পড়ে আমরা সেই প্রয়োজনে লাগবো তবু মাথা নোয়াবো না তোমাদের কাছে।’’ জেনারেল তাকে ফাঁসির ভয় দেখালে ওমর বলেন, ‘‘তোমাদের ন্যায়বিচারের দড়ি সবসময় আমাদের ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলানোর জন্য তৈরি হয়ে থাকে।’’ এভাবেই ওমর মুখতার বীরের বেশে ফাঁসির মঞ্চে নিজেকে সমর্পণ করেন।

ফাঁসির মঞ্চে সব থেকে যা স্মরণীয় হয়ে থাকে তা হলো ওমরের হাতে শক্ত করে ধরে রাখা তার চশমা। ছবিটিতে চশমা অত্যন্ত কাব্যিক এবং প্রয়োজনীয় একটি প্রতীকী হিসেবে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। চশমার এই ব্যবহার প্রথম আমরা দেখি ছবির মাঝামাঝি সময়ে যখন একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থানে ওমর এবং তার সঙ্গীরা যুদ্ধ জয়ের পরে সেখানে যায়। ছোট একটি বালক, যে সদ্য পিতৃহারা হয়েছে তার সঙ্গে ওমরের বন্ধুত্ব হয়ে যায়। ওমরের সঙ্গে বসে কথা বলার সময় বালক সেই চশমাটা ওমরের কাছ থেকে নিয়ে খেলার ছলে পরে। তারও পরে ওমরকে যখন জেনারেলের কাছে নিয়ে আসা হয় তখন জেনারেল সেই চশমা তাকে ফেরত দেন। ছবির শেষে ফাঁসির মঞ্চে সেই বালকের সঙ্গে ওমরের আবার দৃষ্টি বিনিময় হয়। সেই দৃষ্টি যেন বলে দিচ্ছিলো, এই যে ছেলে চশমাটা রেখে গেলাম তোমার জন্য। এই চশমার ঠিক ঠিক ব্যবহার তুমি করতে পারবে আশা করি। এবং ফাঁসির পর যখন মঞ্চ খালি হয়ে যায় বালকটি দেŠড়ে এসে চশমাটা নিয়ে নেয়। অসাধারণ এই দৃশ্যায়নের মাধ্যমে পরিচালক যেন আমাদের একটি মহান বার্তা পৌঁছে দেন আর তা হলো- যে চশমা দিয়ে ওমর মুখতার লিবিয়ার শোষিত জীবন দেখতে পেতেন, যে চশমা দিয়ে লিবিয়ার ভবিষ্যৎ দেখতে পেতেন, সেই চশমা এই বালকটিকে দেওয়ার মধ্যে দিয়ে তাকেও দেখার সুযোগ করে দিলেন। যে দেখার মধ্য দিয়ে একদিন এই বালক যখন বড় হবে সেও ওমর মুখতারের মতো শত্রু চিনতে পারবে, পারবে তার মাতৃভূমি উদ্ধার করতে। যে চশমা একমাত্র ওমর মুখতারের মতো বীরেরাই পরিধান করতে পারেন। রিলের রেসের মতো চশমার প্রজবলিত শিখাটি বালকের মাধ্যমে যেন সম্প্রসারিত করা হলো।

ওমর মুখতারের চরিত্রে এ্যানথনি কুইনের অভিনয় দর্শককে বাক্যহারা করে দেয়। অসাধারণ তার অভিনয় নৈপুণ্য বাস্তব ওমর মুখতারকেও যেন ছাড়িয়ে যায়। ঠিক তেমনি জেনারেল গ্রেজিয়ানির চরিত্রে অলিভার রিড, মাথা থেকে পা পর্যন্ত একজন অত্যাচারী জেনারেল হিসেবে দর্শকের সামনে উপস্থিত থাকেন। অন্য সব চরিত্রের অভিনেতা-অভিনেত্রীরা যার যার জায়গায় অত্যন্ত সফল অভিনয় দেখিয়েছেন। প্রায় চারশ’ মানুষের সমারোহের মাধ্যমে এতসব খন্ডযুদ্ধ যেন সত্যিকার যুদ্ধের রূপ নিয়েছে। ছবিটি ১৯৮১ সালে নির্মিত হলেও ছবিতে যেসব ট্যাংক, রাইফেল, কামানবাহী গাড়ি ব্যবহার করা হয়েছে সেসব কিছু পরিচালক অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে বিশ শতকের প্রথম দিকে যুদ্ধে ব্যবহৃত কামান, ট্যাংক প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে সময়টাকেও যেন সেখানে নিয়ে যেতে পেরেছেন।

লিবিয়ার বিস্তীর্ণ মরুভূমিতে হাজার হাজার কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের বাস্তব চিত্র প্রদর্শিত হতেও আমরা দেখি। ক্যামেরার কাজে জ্যাক হিলইয়ার্ড সার্থক চিত্র এঁকেছেন। ছবির আবহ সঙ্গীতও যেন ছবির সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। সব শেষে পরিচালক মোস্তাফা আক্কাদ যিনি হ্যালোউইন, মোহাম্মদ-মেসেঞ্জার অব গড ইত্যাদি ছবির জন্য ইতোমধ্যেই বিখ্যাত হয়ে আছেন, তার অসাধারণ নৈপুণ্যের কারণে ছবিটি নিখুঁত হয়ে উঠতে সহায়তা করেছে। ইতিহাসনির্ভর যে কোনো ছবি সার্থক করে গড়ে তোলা অত্যন্ত পরিশ্রমলব্ধ কাজ। ছবির সব কলা-কুশলীর সেই পরিশ্রম যেন সার্থক হয়ে উঠতে দেখি আমরা। উপলব্ধি করতে পারি- নিজেদের ভূমিতে অন্যের দখলদারিত্ব দূর করতে, নিজেদের অধিকার, নিজেদের বাকস্বাধীনতা, নিজেদের পরিচয় স্থাপন করতে কত সংগ্রাম আর ত্যাগের প্রয়োজন পড়ে। ওমর মোক্তার তার ত্যাগের মধ্য দিয়ে বিশ্বের পরাধীন এবং স্বাধীন হয়েও যেসব দেশ পরাধীন থাকে তাদের সবাইকে এই পরম শিক্ষা দিয়ে গেছেন। লায়ন অব দ্য ডেজার্ট তাই জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি সার্থক ছবি হয়ে ওঠে।

(প্রথম প্রকাশ: অধুনালুপ্ত সাপ্তাহিক বুধবার)

© 2016. www.oncinemabd.com | Editor & Founder Bidhan Rebeiro | oncinemabd@gmail.com | C: www.bidhanrebeiro.wordpress.com