পর্নোগ্রাফি

প্রাসঙ্গিক রচনা

কানিজ ফাতেমা মিথিলা

মূল: অ্যান্ড্রে ডরকিন* ।। ভাষান্তর: কানিজ ফাতেমা মিথিলা।।

অ্যান্ড্রে ডরকিন

অ্যান্ড্রে ডরকিন “যদিও আমাদের মন খণ্ড-বিখণ্ড, তারপরও কি সুন্দর এক শৃঙ্খলে নিজেদের আমরা দেখতে পাই, অথবা বলতে পারেন পুরুষ দর্শকের দখলদারী মানসে নিজেদের তথাকথিতভাব মেলে ধরি, কখনো আঘাতের কালশিরে শরীরে, কখনো বা হাঁটুমুড়ে, কখনো বা মিথ্যে ব্যথার ভান করে চিৎকার করি, স্যাডিস্টদের আনন্দ দিতে, অভিনয় করি বেশ উপভোগ করছি যেটা আদতে করছি না, আমাদের বোনদের এমন ইমেজ আমরা দেখতে পাই না, এই অন্ধত্ব আমাদের তাড়া করে- আমরা অপদস্ত হই প্রায়ই, এধরনের সত্যিকার অশ্লীল ধারণা দিয়ে, যেখানে যৌনতা ও পুরুষের কর্তৃত্ব অভিন্ন।” -গ্লোরিয়া স্টেইনেম, ইরোটিকা এন্ড পর্নোগ্রাফি

“মেয়েরা যতরকম করেই অপমানিত হোক না কেন, তা শেষ পর্যন্ত রূপকায়িত হয় যৌনতার মাধ্যমে। যে যৌনতা নারীর দায়িত্বের মধ্যে ফেলা হয়, এই যৌনতাই আবার নারীর লজ্জা, আবার বেশ্যাবৃত্তি, কখনো কখনো আত্ম-কালিমালেপন। এই বিষয়গুলোর প্রভাব সব নারীই অনুধাবন করেন, তবে সেটি যে সবসময় শতভাগ অনুধাবন করেন তা নয়, বলতে পারেন কার্যকরভাবে নারীরা বিষয়গুলো অনুধাবন করেন না। এই সকল কথাকে চারটি অক্ষরে গুটিয়ে আনা যায়। না fuck নয়, cunt(কামের সামগ্রী হিসেবে বিবেচিত নারী)। আমাদের আত্ম-ঘৃণার জন্ম এখান থেকেই; আমরা কামের সামগ্রী, এই ভাবনা থেকে। আর এটাই আমাদের জীবনের নির্যাস, আমাদের পাপ।” -কেট মিলেট, দ্য প্রস্টিটিউশন পেপারস

“যতই বেশ্যা নিধন করি, পরিতৃপ্তি আসে না।” -ইউরিপিডিসের ওরেসটেস, ওরেস্টেস

পর্নোগ্রাফি শব্দটি প্রাচীন গ্রীক শব্দ পর্ন ও গ্রাফোস থেকে উদ্ভূত যার অর্থ-বারাঙ্গণাদের সম্পর্কে লেখালেখি। পর্ন শব্দের অর্থ ‘বেশ্যা’, আরো পরিষ্কারভাবে বললে, সবচে নিচুজাতের গণিকা, প্রাচীন গ্রীসে এসব গণিকারা সকল পুরুষের জন্য সহজলভ্য ও সস্তা ছিল, সমাজের সব স্তরের পুরুষই তাদের কাছে যাতায়াত করতে পারতেন। তারা ছিলেন সকল নারীদের মধ্যে এমনকি দাসদের মধ্যেও সবচেয়ে সস্তা, সবচে অসম্মানিত ও সবচে অরক্ষিত। খাস বাংলায়, পর্নিয়ারা ছিলেন কেবলমাত্র এবং একমাত্র যৌনদাসী। আর ‘গ্রাফোস’ অর্থ হল-লেখা বা চিত্রায়ন।
ফলে, পর্নোগ্রাফি শব্দের অর্থ কোনভাবেই ‘যৌনকর্মের বিবরণ’ কিংবা ‘কামোদ্দীপক বর্ণনা’, ‘নগ্নতার চিত্রায়ন’ ‘যৌনতার উপস্থাপন’ কিংবা এ গোছের কিছু নয়, বরং পর্নোগ্রাফির একমাত্র অর্থ- জঘন্য, সস্তা, নিকৃষ্ট ‘বেশ্যা’ রূপে নারীর চিত্রায়ন। প্রাচীন গ্রীস যত ধরণের যৌনকর্মী ছিলেন তাদের মধ্যে পর্নিয়ারা যতটা নিকৃষ্ট বিবেচিত হতেন, তেমনটা আর কেউই হতেন না।
একালের পর্নোগ্রাফি নারীকে ঠিক একইভাবে উপস্থাপন করে তার শব্দগত বুৎপত্তির প্রতি চরম সুবিচার করেছে। ক্যামেরার বদৌলতে কেবল গ্রাফোসের মানেই কিছুটা পাল্টেছে। পর্নোগ্রাফি এখন পাওয়া যায় স্থিরচিত্র, ফিল্ম, ভিডিওসহ সকল দৃশ্যমাধ্যমে। ধরণ ও সংখ্যার দিক থেকে চিত্রায়নের উপায় অনেক বেড়েছে কিন্তু এর সারবস্তু সেই একই, অর্থ একই, উদ্দেশ্য একই, চিত্রায়িত নারীর সম্মান, তার যৌনতা, তার মূল্যও একই রয়ে গেছে। তবে, আগের পর্নোগ্রাফিতে বাস্তব নারীর প্রয়োজনীয়তা না থাকলেও পর্নিয়াকে ফুটিয়ে তুলতে একালে আধুনিক প্রযুক্তির আবশ্যিকভাবে প্রয়োজন হয় একজন বাস্তব নারীর।
নিচুজাতের ‘বেশ্যাদের’ চিত্রায়ন, এটাই পর্নোগ্রাফির একমাত্র অর্থ, এছাড়া পর্নোগ্রাফি শব্দের অন্যকোন মানে আগেও ছিলনা, এখনও নেই। একজন ‘বেশ্যা’র অস্তিত্বই পুরুষকে যৌনসেবা দেয়ার জন্য। পুরুষের যৌন আধিপত্যের কাঠামোর মধ্যেই ‘বেশ্যা’ বিরাজ করে। বস্তুত, এ কাঠামোর বাইরে ‘বেশ্যা’ ধারণার কোন অর্থ নেই। পুরুষের যৌন আধিপত্য বিদ্যমান না থাকলে ‘বেশ্যা’ শব্দটির কোন মানেই থাকেনা। এ ধরণের একটি দল, বেশ্যার ধারণা, এর অপমান, এ সংক্রান্ত সকল পেশা, এর ব্যবসা, এর বর্ণনা, এর পণ্যায়ন, ‘বেশ্যা’ হিসেবে একজন নারীকে আলাদাভাবে চিহ্নিতকরণ- এসব, সকল কিছুই পুরুষের সৃষ্টি। পুরুষের যৌন আধিপত্যের বস্তুনিষ্ঠ ও বাস্তব কাঠামোর মধ্যেই একজন ‘বেশ্যা’ টিকে থাকে। ঐ কাঠামোর মাঝে একজন নারী শুধুমাত্র যৌনবস্তু, তার আর কোন সত্ত্বা নেই। তাকে নিষ্ক্রিয় বস্তু হিসেবে গন্য করা হয়। ফলে, পর্নোগ্রাফিতে ব্যবহৃত নারীর যৌনতাও একইভাবে মূল্যায়িত হয় এবং পর্নোগ্রাফিক বাস্তবতায় অন্যসকল নারী এবং তাদের যৌনতাকে সেভাবেই মূল্যায়ন করা হয়। পর্নোগ্রাফিক প্রেজেন্টেশনে পুরুষের যে বল প্রয়োগের চিত্র দেখা যায়, সেটিও বস্তুনিষ্ঠ ও বাস্তব। এই বলপ্রয়োগ মূলত সকল নারীর বিরুদ্ধেই ব্যবহৃত। পর্নোগ্রাফিতে একজন নারীকে চরমভাবে অবমূল্যায়ন করা হয়, কেননা পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোয় প্রত্যেক নারীই চরমভাবে অবমূল্যায়িত। পর্নোগ্রাফিতে নারীর যে ‘ব্যবহার’ দেখা যায়, মূলত বাস্তব জীবনেও সকল নারী পুরুষের মধ্যে সেই ‘ব্যবহার’ উপস্থিত। পর্নোগ্রাফিতে নারীকে যেভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়, বাস্তবিক নারীও সেই একই সংজ্ঞা ও কাঠামোর মধ্যে বন্দী হয়ে পড়েছে। পর্নোগ্রাফিকে সাধারণত যৌনকর্মের উপস্থাপন কিংবা যৌনতার চিত্রায়ন বলে মনে করা হয়ে থাকে এবং সমাজে পর্নোগ্রাফির যতটা চাহিদা রয়েছে ঠিক ততটাই এটিকে নোংরা বিষয় বলা হয়।। নারীর যৌনতাকেও তাই অত্যন্ত জঘন্য, নোংরা ও সস্তা বিষয় হিসেবে গন্য করা হয়। কেট মিলেট লিখেছেন-“আমরা(নারীরা) কেবল মাত্র একটি জননেন্দ্রিয়……………..এটিই আমাদের অস্তিত্ব, আমাদের অপরাধ।” পর্নোগ্রাফিকে নোংরা মনে করার যে প্রবনতা তা নারীর যৌনতাকেও নোংরা হিসেবে বিবেচনা করে। পর্নোগ্রাফিতে নারীর শরীরকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়, সকল নারীর শরীরকে ঠিক একইভাবে মূল্যায়ন করা হয়। অনেকের মতে, পর্নোগ্রাফি নারীর যৌনতাকে নোংরা হিসেবে উপস্থাপন করে না। কিস্তু, মূলত পর্নোগ্রাফি এই ধারণারই বিস্তার ঘটায় এবং বিক্রি করে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে, সিনেমা ও সঙ্গীতশিল্প যৌথভাবে যতটা লাভ করে তার চেয়ে এককভাবে অনেকবেশি মুনাফা অর্জন করে পর্নোগ্রাফি ইন্ডাস্ট্রি। এমনকি, চরম অর্থনৈতিক মন্দার সময়েও, এর চাহিদা কমে না। পুরুষ ভোক্তারা চরম আর্থিক সঙ্কটের মধ্যেও এর জন্য বিপুল ব্যয় বহন করতে রাজি থাকে। নারীকে নোংরা ‘বেশ্যা’ রূপে কিনতে পুরুষরা বরাবরই উদগ্রীব। পর্নোগ্রাফি এখন ক্যাবল টেলিভিশনের মাধ্যমে প্রচার করা হয়, পুরুষ ভোক্তারা যাতে ঘরে বসে পর্নোগ্রাফি উপভোগ করতে পারেন সেজন্য নানাপ্রকারের ভিডিও মেশিন বাজারজাত করা হচ্ছে। তাই, পুরুষ ভোক্তার চাহিদা পূরণ করতে এবং দিনকেদিন মুনাফা বাড়িয়ে চলতে প্রযুক্তি আরো নিত্যনতুন পর্ণিয়া সৃষ্টিতে ব্যস্ত। বাস্তবের নারীকে পিটিয়ে, ঝুলিয়ে, ছেঁচড়ে, আঁটসাট করে নানাধরণের সহিংস ভঙ্গিমায় পর্নিয়ায় রূপান্তর করছে প্রযুক্তি। মুনাফার উদ্দেশ্যে আজকের এসব দালালদের প্রযুক্তির নানাবিধ ব্যবহার বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তার সর্বোচ্চ ব্যবহার ঘটিয়ে নতুন নতুন পর্ণিয়ার যোগান দিতে এবং নারীর প্রতি এ সহিংসতাকে জনপ্রিয় করে তুলতে হয়। পর্নোগ্রাফির কেবল একটি মাত্র স্থির ছবিই কয়েক হাজার শব্দ প্রকাশ করে। বাজারের চাহিদা পূরণে এমন অসংখ্য ছবির যোগান দিতে হয়, আর এসব ছবির চিত্রায়নের জন্য প্রচুর পরিমাণে পর্নিয়াও সৃষ্টি করতে হয়। প্রযুক্তি তার নিজস্ব স্বভাব অনুযায়ী প্রচুর পরিমানে নারীর নিষ্ক্রিয় গ্রাফিক চিত্রায়নকে উৎসাহিত করে চলে। যত বেশি মানুষ প্রযুক্তির আওতায় আসে, এর হার ততই বৃদ্ধি পায়। প্রযুক্তির তৈরি করা এ বিভ্রমের প্রতি পুরুষ দর্শক আরো বেশি মাত্রায় বিশ্বাসী, আগ্রহী ও নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এর মধ্য দিয়ে নারীর এই চরম অপমানজনক উপস্থাপনকে প্রযুক্তি ক্রমাগত বৈধতা দিতে থাকে।
এই পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থায়, নারীর মানেই হল যৌনতা, আর নারীর যৌনকর্ম মানেই ‘গণিকাবৃত্তি’, গণিকা হবার অর্থ হল পর্ন, অর্থাৎ সবচেয়ে নিচুজাতের ‘বেশ্যা’ যার ওপর সমাজের সকল পুরুষের অধিকার রয়েছে। ফলে, পর্নিয়াকে ক্রয় করা মানে পর্নোগ্রাফি কেনা, তাকে পাওয়া মানে পর্নোগ্রাফি পাওয়া, তাকে দেখা মানে পর্নোগ্রাফি দেখা। যৌনক্রিয়ারত নারীকে দেখার অর্থ একজন ‘বেশ্যার’ যৌনক্রিয়া দেখা। নারীকে চাওয়া কিংবা তাকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার অর্থ পর্নোগ্রাফির আকাঙ্ক্ষা করা। তাই, এই পুরো ব্যবস্থায় নারী হবার অর্থ হল অন্যের জন্য পর্নোগ্রাফি হওয়া।

*লেখক পরিচিতি
অ্যান্ড্রে ডরকিন। মার্কিন র‌্যাডিকাল নারীবাদী এবং লেখক। জন্ম-১৯৪৬ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর, যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে। ১৯৬০ সালের দশকের শেষ দিকে তিনি যুদ্ধবিরোধী ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী হিসেবেই বেশি পরিচিত ছিলেন। র‌্যাডিক্যাল ফেমিনিস্ট থিওরি ও প্র্যাকটিসের ওপর তাঁর প্রায় ১০টি বই প্রকাশিত হয়েছে। পরে, যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৭০-৮০, এই দশক ধরে চলা পর্নোগ্রাফি বিরোধী আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তি হয়ে ওঠেন ডরকিন। পর্নোগ্রাফি নিয়ে লেখা তাঁর সাড়াজাগানো বই-Pornography: Men Possessing Women প্রকাশিত হয় ১৯৮১ সালে। এতে পর্নোগ্রাফির উৎপত্তি থেকে শুরু করে আজকের মুনাফাভিত্তিক সমাজে পর্নোগ্রাফিক বাস্তবতায় নারীর অবস্থান ও পর্নোগ্রাফি-বিরোধী আন্দোলনের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে আলোচনা করেছেন তিনি। উপরে ভাষান্তরিত লেখাটি ডরকিনের উল্লিখিত বই থেকেই নেয়া হয়েছে। ডরকিনের মতে, নারীর বিরুদ্ধে সংঘটিত যেকোন ধরণের যৌন নিপীড়ন এবং ধর্ষণের সঙ্গে পর্নোগ্রাফির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ২০০৫ সালের ৯ এপ্রিল, দীর্ঘদিন মিওকারডাইটিস রোগে ভোগার পর, ৫৮ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডি.সিতে মারা যান অ্যান্ড্রে ডরকিন।

© 2016. www.oncinemabd.com | Editor & Founder Bidhan Rebeiro | oncinemabd@gmail.com | C: www.bidhanrebeiro.wordpress.com