চাঁদে উড়াল: কল্পবিজ্ঞান চলচ্চিত্রে প্রণয়

অনুবাদ

বর্ণনা ভৌমিক কথা

মূল: ড্যানিয়েল এম কিমেল ।। ভাষান্তর: বর্ণনা ভৌমিক কথা ।। সাইফাই মুভির পোস্টার মেরুকরণের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আমরা ‘লাল রাজ্য’ আর ‘নীল রাজ্য’ এভাবে চিন্তা করতে শিখেছি। হয় তোমাকে এই পক্ষে থাকতে হবে নয়তো অন্য পক্ষে। মাঝামাঝি কোন অবস্থান নেই। আর এধরণের বাইনারি চিন্তার প্রতিফলন ঘটছে আমাদের জীবনের সব জায়গাতেই । আর চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে এই বাইনারি চিন্তার প্রতিফলনে একদিকে রয়েছে ‘guy movies’ যেগুলো সাধারণত এ্যাকশনধর্মী, নায়কোচিত মারপিট, যুদ্ধের সিনেমা হিসেবেই আমাদের কাছে বেশি পরিচিত । আর অন্যদিকে রয়েছে ‘chick flicks’ বা রোমান্টিক সিনেমাগুলো। আর কোন দিকেই না গেলে সিনেমা হবে বিরক্তিকর। যেখানে রোমান্স আর কমেডির সমন্বয় করা হয়েছে. সেটাকে বলা হবে- দেখেছো? এ ছবি তো সক্কলের জন্য।

আর সাইন্স ফিকশন চলচ্চিত্রের বিপননের ক্ষেত্রে মূল বিবেচ্য হচ্ছে প্রচুর এ্যাকশন দৃশ্য আর স্পেশাল ইফেক্ট । আর সাইন্স ফিকশনে প্রেম থাকবে পার্শ্বকাহিনী হিসেবে। কিন্তু যেসব দর্শক ইনসেপশন এর মতো সিনেমাকে হিট বানিয়েছে সিনেমা শেষে তারা কিন্তু নায়ক আর তার প্রয়াত স্ত্রীর মধ্যের সম্পর্ক নিয়েই আলোচনা করে। আবার ইনসেপশন সিনেমার ‘স্বপ্নের মধ্যে স্বপ্ন”/ dreams within dreams কে কী এ্যাকশন দৃশ্য বলা যায়? আসলে এর এক মাত্র কারণ হচ্ছে সিনেমার বিপননে নিয়োজিত মানুষরা এভাবেই চিন্তা করে।কিন্তু তার মানে তো এই নয় , যে চলচ্চিত্র নির্মাতারাও তাদের মতো করে ভাববে। একইভাবে আমরা যারা দর্শক তারাও যে এসব কারণেই সাইন্স ফিকশন সিনেমাগুলো কিনি এমন ভাবার কোন কারণ নেই। প্রকৃতপক্ষে সাইন্স ফিকশন সিনেমাগুলোর কেন্দ্রীয় বিষয় হচ্ছে প্রেম, তা সফলই হোক বা ব্যর্থ । বিষয়টা এমন, কোন কোন সাইন্স ফিকশনে প্রেমকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেনো সবাই বুঝতে পারে, আবার অনেক সাইন্স ফিকশনে প্রেমের প্রভাব এতটাই সূক্ষ যে ধরাই যায়না।
এই আলোচনার শুরুটা করা যেতে পারে সেই ১৯২৭ সালের মেট্রোপলিস সিনেমা দিয়ে। ত্রিভুজ প্রেমের তিক্ততা নিয়েই সিনেমার গল্প এগিয়ে যায়। ধনী শিল্পপতির জো ফ্রেডারসনের ছেলে ফ্রেডার, প্রেমে পড়ে মারিয়ার। আর তরুণী মারিয়া শিল্প কারখানার গরীব শ্রমিকদের জীবনযাপনের মান উন্নয়নে কাজ করে ।অন্যদিকে বিজ্ঞানী রোটওয়াং, মারিয়ার ভাবমূর্তি নষ্টের জন্য একটি রোবট বানায়, যেটি মূলত মারিয়ার শয়তান সংস্করণ। তবে আসল ত্রিভুজ প্রেম ঘটে গেছে আরো এক প্রজন্ম আগে। ২৫ বছর আগে একই নারীর জন্য একসময় প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল ফ্রেডারসন আর রোটওয়াং। কিন্তু মেয়েটি রোটওয়াংকে ছেড়ে ফ্রেডারসনকে বিয়ে করায় শিল্পপতিকে কখনো ক্ষমা করতে পারেনি সে। এদিকে বিয়ের পর ফ্রেডারসনের একটি ছেলে হয় কিন্তু বাচ্চা হতে গিয়ে মারা যায় মেয়েটি। ফ্রেডারসন তার প্রয়াত স্ত্রীর প্রতি ভালবাসা থেকে ছেলেকে বড় করে তোলে আর মনোনিবেশ করে কাজের দিকে। আর এ ঘটনার পর থেকে ধীরে ধীরে পাগল হয়ে যেতে থাকে রোটওয়াং। একপর্যায়ে ফ্রেডারসনের সহকর্মী হিসেবে যোগ দেয় রোটওয়াং আর সুযোগের অপেক্ষা করতে থাকে। এদিকে মারিয়া শ্রমিকদের উসকে দিলে তাকে থামানোর জন্য রোটওয়াংয়ের সাহায্য চায় ফ্রেডারসন। আর এতবছর পর ফ্রেডারসনের কাছে ভালাবাসা হারানোর প্রতিশোধ নেয়ার সুযোগ পায় রোটওয়াং। তার তৈরী রোবট নকল মারিয়ার মাধ্যমে মেট্রোপলিসকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায় সে। কিন্তু নতুন প্রজন্ম আংশিকভাবে সিনেমাটি দেখলে বুঝবেই না যে প্রেমে ব্যর্থতার প্রতিশোধ নিচ্ছে রোটওয়াং। বরং সিনেমার গল্প তাদের বিশ্বাস করতে বাধ্য করবে যে শুধুমাত্র পাগল বিজ্ঞানী বলেই সে এরকম আচরণ করছে।
একইভাবে ব্রাইড অব ফ্রাঙ্কেস্টাইন (১৯৩৩) সিনেমাতেও কেন্দ্রীয় বিষয় হচ্ছে প্রেমের ব্যর্থতা। ড. ফ্রাঙ্কোস্টাইন তার নববধূ এলিজাবেথকে খুব ভালবাসে। কিন্তু শয়তান ড. প্রিকারিয়াস প্রাণ সৃষ্টির নতুন ধরণের গবেষণার জন্য এলিজাবেথকে অপহরণ করে। আর গতানুগতিক সিনেমার মতো মনস্টার/শয়তান এলে চিৎকার করা ছাড়া আর কোন কাজ নেই এলিজাবেথের। আর প্রাণ সৃষ্টির পরীক্ষা চালাতে গেলেই বিপত্তি বাধে রোমান্টিক ট্রাজেডি এ সিনেমায়। এই পরীক্ষায় আসল মনস্টারের সঙ্গী হিসেবে একটি মেয়ে মনস্টার তৈরী করা হয়। কিন্তু একজন বৃদ্ধ অন্ধ মানুষ মনস্টারকে কথা বলতে শেখানোর পর থেকে তার মধ্যে মানবিক বোধ সৃষ্টি হয়। শিক্ষকটি অন্ধ হওয়ায় মনস্টারকে দেখে সে ভয় পায় না বরং তার সঙ্গে উষ্ণ আচরণ করে। ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসে মনস্টারের মধ্যে। এরপর নতুন মেয়ে সঙ্গীর কাছ থেকেও এরকম সঙ্গের প্রত্যাশায় তার কাছে ছুটে যায় মনস্টার। কিন্তু মেয়ে মনস্টারের ভীতিকর আচরণ দেখে সে কষ্ট পায়। ল্যাবরেটরী ধ্বংসের সময় ফ্রাঙ্কেনস্টাইন দম্পতিকে উদ্ধার করে মনস্টার। আর মনস্টার, তার মেয়ে সঙ্গী আর ড, প্রিকারিয়াস ধ্বংসস্তুপের নিচে চাপা পড়ে মারা যায়। যদি মনস্টার ভালবাসা কী নাই বুঝতো তাহলে সে আর ফ্রাঙ্কেনস্টাইন দম্পতিকে বাঁচাতো না।

১৯৫০ এর দশকে এসে প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে অনেক সাইন্স ফিকশন তৈরী হয়। এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে স্বীকৃতি না পেলেও প্রেম নিয়ে সাইন্স ফিকশন নির্মাণ হয়। দ্যা ডে দ্যা আর্থ স্টুড স্টিল (১৯৫১) সিনেমার গল্প আবর্তিত হয়েছে যুদ্ধে বিধবা হওয়া এক নারী আর তার প্রেমিককে নিয়ে। এলিয়েন ক্ল্যাটুর কথা কর্তৃপক্ষকে ফোন করে জানিয়ে দেয় মেয়েটির প্রেমিক। সিনেমার শেষ পর্যায়ে নিজ গ্রহে ফিরে যায় ক্ল্যাটু । কিন্তু মেয়েটা ছোট্ট ছেলের সঙ্গে ক্ল্যাটুর সখ্যতা গড়ে ওঠায় তার প্রেমে পড়ে যায় সে। ইনভেশন অব দ্যা বডি স্ন্যাচারস (১৯৫৬) সিনেমায় দেখা যায়, সদ্য বিচ্ছেদ হওয়া মাইলস আর বেকির সম্পর্ক।
প্রেমের বিবেচনায় সেই সময়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় সিনেমা বলা যেতে পারে ফরবিডেন প্ল্যানেট (১৯৫৬)কে । যেখানে ইউনাইটেড প্ল্যানেটের অভিযাত্রীরা পৃথিবীর হারিয়ে যাওয়া এক উপনিবেশ আবিষ্কার করে। ডাক্তার মরবিয়াস আর তার মেয়ে আলতাইরা, এই দুই জন ছাড়া আর কেউ টিকে নেই সেখানে। সিনেমাটা ভালভাবে বোঝার জন্য ছেলেগুলো আলতাইরার সঙ্গে কেমন আচরণ করে আর সে কেমন প্রতিক্রিয়া দেখায় সেটা লক্ষ্য করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ‘অবচেতন মনের শয়তান’ বিষয়টির সঙ্গে এই ঘটনাগুলো সরাসরি জড়িত। ড. মরবিয়াস যখন এলিয়েনদের যন্ত্র দিয়ে তার মেয়ের যৌনাবেদনময়ী একটি ইমেজ তৈরী করে তখন মেয়ের প্রতি তার আগ্রহ যে খুবই অস্বাভাবিক সেটা বোঝা যায়। বিভিন্ন কর্মকর্তারা আলতাইরার মন জেতার চেষ্টা করে কিন্তু এ বিষয়ে তার কোন পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকায় কোন প্রতিক্রিয়াই দেখায় না সে। এই সময়ের দৃশ্যগুলো খুব হাসির খোরাক জোগায়। শেষ পর্যন্ত কমান্ডার এ্যাডামস তার সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করতে পারে। এর আগে আলতাইরাকে মরবিয়াসের বাড়ির আশেপাশে বিভিন্ন প্রাণীর সঙ্গে কোন ভয় ছাড়াই মিশতে দেখি আমরা। কিন্তু ভালবাসার অনুভূতি পাওয়ার পর-১৯৫৬ সালের সাইন্স ফিকশন সিনেমায় যা শুধু চুম্বন দেখানো পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল দেখা যায় একটা বাঘ তার ওপর ঝাপিয়ে পড়লে , কমান্ডার রে গান দিয়ে বাঘটিকে থামিয়ে দেয়। আর এঘটনায় খুব বিস্মিত হয় আলতাইরা। আগে কখনোই প্রাণীরা তার সঙ্গে এরকম আচরণ করেনি আর সেও পার্থক্যটা বুঝতে পারেনি। পার্থক্য , অবশ্যই তার বাবা তাকে যে অবুঝ মেয়ে করে রাখতে চেয়েছিল, প্রেমের অনুভূতি পেয়ে সে এখন আর সেই ছোট্ট মেয়েটি নেই।

আরো সাম্প্রতিক দশকে এসে শুধু প্রেমকে কেন্দ্র করে সাইন্স ফিকশন চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু হয়। যেমন ১৯৮৬ সালে দ্যা ফ্লাই চলচ্চিত্রটির রিমেক করা হয়। খুবই রোমান্টিক এ মুভিতে সেথ ব্রুনডেল প্রেমে পড়েন আকর্ষণীয়, মেধাবী সাংবাদিক ভেরোনিকা কুয়াইফের। সেথের ম্যাটার ট্রান্সপোর্টার গবেষণায় আগ্রহ দেখায় ভেরোনিকা। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে ব্রুনডেল আবিষ্কার করে ভেরোনিকার সঙ্গে তার সাবেক প্রেমিক এবং সম্পাদক স্থাথিস বোরন্সের ঝামেলাপূর্ণ একটা সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে ভেরোনিকা তাকে ছেড়ে গেছে বলে খুবই অসুখী বোরেন্স সারাদিন তার চিন্তাই করে। এগিয়ে যেতে থাকে ত্রিভুজ প্রেমের গল্প। কিন্তু এই সাইন্স ফিকশন ট্রাজেডির শেষ পর্যায়ে শুধুমাত্র হিংসার বশবর্তী হয়ে ঝুকিঁ নিয়ে নিজের ওপরই ম্যাটার ট্রান্সমিটার চালিয়ে দেয় ব্রুনডেল। কিন্তু ঐ চেম্বারে সে ছাড়াও যে একটা মাছি ছিল এটা লক্ষ্য করে না সে আর এর পরিণতি হয় ভয়াবহ।

অনেকেই মনে করেন দ্যা ফ্লাই সিনেমাটি শুধু প্রেম আর হিংসা নিয়েই তৈরী হয়েছে।অনেকে আবার এ সিনেমাকে ‘সত্যিকার অর্থে’ সাইন্স ফিকশনের স্বীকৃতিও দিতে নারাজ। কিন্তু না, অবশ্যই এটা একটা সাইন্স ফিকশন মুভি ।এটা এমন এক সাইন্স ফিকশন গল্প যেখানে দেখানো হয়েছে ব্যর্থ প্রেম কিভাবে আরো ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। প্রেমে ব্যর্থ হয়ে এমন এক অদ্ভূত পরীক্ষায় নিজেকে জড়িয়ে ফেলে মানুষ যে জীবনটাই পাল্টে যায় এই তিনজনের। সিনেমার শেষ পর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। আর এ্ভাবেই প্রেম আর সাইন্স ফিকশন উপাদানের সমন্বয়ে হরর একটা গল্প তৈরী হয়।
১৯৮০ সালের দশকে আরেকটি চলচ্চিত্র রোমান্টিক হিসেবে মনে রাখার মতো। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেখার পর মনে হয়েছে সময় অনুকূলে ছিলনা সিনেমাটির। স্টারম্যান (১৯৮৪) সিনেমার কারণে ই.টি. র মতো চলচ্চিত্র ছেড়ে দেয় কলম্বিয়া পিকচার্স। ভিনগ্রহের এক আগন্তুক নিয়ে ইতিমধ্যেই তাদের হাতে সিনামা তৈরী হচ্ছে বলে তারা আর ইটি প্রযোজনা করেনি। ভিনগ্রহের অধিবাসী স্টারম্যান, উইসকনসিনে অবতরণ করে। স্পেসশিপে ফিরে যাওয়ার জন্য তাকে এ্যারিজোনায় যেতে হবে। একারণে সে জেনি হেইডেনের প্রয়াত স্বামীর জেনেটিক্যাল ক্লোনে রূপান্তরিত হয়। সিনেমায় প্রথমে দেখানো হয় জেনি আর তার স্বামী বাসায় বসে সিনেমা দেখছিল। সিনেমা দেখতে দেখতেই মারা যায় তার স্বামী ।ঐ সময় জেনি তার ম্বামীকে বিদায়ও জানাতে পারলোনা দেখে খুব কষ্ট হয়েছিল । ইটি আর ক্ল্যাটুর মতো স্টারম্যানকেও তার গ্রহে ফিরে যেতে হবে। কিন্তু স্টারম্যানের মাধ্যমে জেনি আর তার স্বামীর পরম চাওয়া, একটা সন্তান পাওযার সুযোগ পায় সে। শারীরিক কিছু জটিলতার কারণে সে মা হতে পারছিল না। কিন্তু অভাবনীয়ভাবে স্টারওয়ান, জেনির এই সমস্য ঠিক করে দেয়। তাদের ভালবাসাবাসির পর জেনির যেন একটা সন্তান হয়। যেহেতু স্টারম্যান তার স্বামীর ক্লোন তাই এই বাচ্চাটিই তার কাছে পরম আরাধ্য।
তবে ১৯৮৪ সালে স্টারম্যান দেখে এরকম মনে হয়েছিল । স্টারম্যানের নাম ভূমিকায় জেফ ব্রিজ এর অস্কার মনোনয়ন পাওয়া অভিনয় সবাই মনে রেখেছে । কিন্তু আজ এসে স্টারম্যান আবার দেখলে আর এরকম মনে হয়না।সরাসরি বলতে গেলে স্টারম্যান দেখে খুব বিরক্তিকর লাগে। এখন মনে হয় আক্ষরিক অর্থে স্টারম্যান জেনিকে অপহরণ করেছিল।আর স্টকহোম সিনড্রোমের শিকার জেনি তার মিশন সম্বন্ধে বুঝতে পারে। আর সাময়িকভাবে স্টারম্যান জেনির স্বামীর জেনেটিক্যাল ক্লোন হলেও আসলে তো আর সে জেনির স্বামী নয়।আর স্টারম্যান যত বিনয়ীই হোক জেনির সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করাটা ধর্ষণের পর্যায়ে পড়ে। আর তারপর জেনিকে একটা সন্তান দিয়ে সে চলে যায়। যেকোন সাইন্স ফিকশনের জন্য এটা দু:খজনক যে এটাকেই বলা হচ্ছে “সুখকর সমাপ্তি” বা হেপি এ্যান্ডিং। এটাকে মর্মস্পর্শী প্রেমের গল্প হিসেবে দেখো বা কৌশলী বলাৎকার, যেভাবেই দেখো স্টারম্যান আর জেনির প্রেম নিয়েই সিনমোর কাহিনী। আর এই দুইজনের সম্পর্ক আদৌ প্রেম বা প্রেম নয় এ বিতর্ক হচ্ছে এ সিনেমার মূল চালিকাশক্তি।

আবার অনেক সাইন্স ফিকশন চলচ্চিত্রে ভালবাসার গল্পগুলোর পরিণতি ভাল হয়না , তবে সবগুলোই যে খারাপ হয় তা নয়। বিখ্যাত সামাজিক বিদ্রুপাত্মক সিনেমা দ্যা ট্রুম্যান শো (১৯৯৮) সিনেমায় দেখা যায় , সারাবিশ্বের টেলিভিশনের দর্শকদের বিনোদন দেয়ার জন্য ট্রুম্যানকে জন্ম থেকেই একটা কৃত্রিম জগতে রাখা হয়েছে । যেখানে তার জীবনের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকেই আসলে অভিনেতা আর তার সঙ্গে যা ঘটছে এমনকি দুর্ঘটনাটাও আগে থেকেই চিত্রনাট্যে লেখা আছে। তবে বিপত্তি তখনই ঘটে যখন চিত্রনাট্য অনুযায়ী মেরিল কে বিয়ে করার কথা থাকলেও লরেন্সের প্রেমে পড়ে যায় ট্রুম্রান । এরপর লরেন্স চরিত্রের অভিনেত্রীকে দ্রুত সেই টিভি শো থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় । আর চিত্রনাট্য অনুযায়ী ট্রুম্যানকে মেরিলকে বিয়ে করার দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। একপর্যায়ে দেখা যায় মধ্যরাতে বিভিন্ন মেয়ের ছবি কেটে কেটে জোড়া লাগিয়ে লরেন্সের মতো একটি চেহারা দাঁড় করাতে চায় ট্রুম্যান। মেয়েটা তার থেকে অনেক দূরে , নাগালের বাইরে এমন বাস্তব অবস্থা জানা সত্ত্বেও হাল ছাড়েনা ট্রুম্যান। অন্যদিকে ঐ অভিনেত্রী তাকে সাহায্য করতে না পারলেও বাইরের বিশ্বে আরো কিছু মানুষ নিয়ে এই অনুষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তোলে। তাদের ভালাবাসা বাস্তব হলেও ট্রুম্যান বের না হয়ে আসা পর্যন্ত লরেন্সের কিছুই করার থাকেনা। সত্য আর স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা থেকে শেষপর্যন্ত ঐ টিভি শো থেকে বের হয়ে আসতে পারে ট্রুম্যান। আর এই স্বাধীনতা বোধ থেকেই টিভি শোর তৈরী চরিত্র থেকে বের হয়ে আসে ট্রুম্যান। আর যে মেয়েকে সে সত্যি ভালবেসেছিল তাকেই অর্জন করে ট্রুম্যান।
ইদানিংকার চলচ্চিত্র গুলোতেও প্রেম মূল চালকের ভূমিকা পালন করে। মুন চলচ্চিত্রে দেখা যায় স্যাম বেল চরিত্রটি চাঁদের একটি খনি অভিযান পরিচালনা করে । কিন্তু প্রাণহীন একটা রোবট ছাড়া চাঁদে আর কোন সঙ্গী না থাকায় স্যাম ধীরে ধীরে পাগল হয়ে যেতে থাকে । পৃথিবীতে থাকা তার স্ত্রী ছাড়া বাস্তব জগতের আর কারোর সঙ্গেই যোগাযোগ থাকে না তার । তবে সিনেমা এগোতে থাকলে অবাক বিস্ময়ে আমরা খেয়াল করি তাদের অবস্থা নিয়ে আসলে সে যা ভাবছে তা সবই বাস্তব। আর হালের ব্লকবাস্টার এ্যাভাটারের নায়ক জ্যাক, যুদ্ধাহত এক পঙ্গুসেনা। ভিনগ্রহের আদিবাসীদের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য তাদের আদলে বানানো শরীরে যখন জ্যাকের মনকে স্থানান্তর করা হয় তখন নিজের হারিয়ে যাওয়া স্বত্তাকেই যেনো খুজেঁ পায় সে । বড় বড় সিনামার সব ইস্যু- জীববৈচিত্র রক্ষা থেকে কর্পোরেট লালসা সব বিষয় সিনেমায় উপস্থিত থাকলেও আদিবাসী নারী নেইতিরির জন্য জ্যাকের ভালাবাসাই মুখ্য হয়ে ওঠে এখানে । এই ভালবাসাই জ্যাককে আদিবাসী নেইভি গোষ্ঠীর দৃষ্টিভঙ্গি বুঝে উঠতে সাহায্য করে। তাই নেইতিরির গোষ্ঠীর লোকদের রক্ষা করাই একমাত্র উদ্দেশ্য নয় জ্যাকের। বরং জাতিগত ভেদাভেদ দূর করে নেইতিরির সঙ্গে স্থায়ীভাবে কিভাবে থাকা যায় সেটাই জ্যাকের মুখ্য উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে। তবে চলচ্চিত্র পরিচালক জেমস ক্যামেরন হঠাৎ করে শুধু জ্যাকের চরিত্রেই হৃদয়বৃত্তিক আচরণ তুলে ধরেছেন তা নয়। বরং তার পরিচালনায় টার্মিনেটর , এলিয়েনস বা দ্যা এবিস এর মতো সিনেমাগুলোতেও এরকম হৃদয়বৃত্তিক আচরণ লক্ষ্য করা গেছে।

একটা মজার সিনেমার গল্প দিয়ে শেষ করবো। হ্যাপি একসিডেন্ট সাইন্স ফিকশন সিনেমাটি আমাদের কাছে খুব একটা পরিচিত নয়। চলচ্চিত্রটি একেবারেই গতানুগতিক রোমান্টিক কমেডি ধারার। একদিকে নায়িকা রুবি ওয়েভার। অন্যদিকে নায়ক স্যাম ডিড সুদর্শন, আকর্ষণীয়, রসবোধসম্পন্ন আর রুবির জন্য একদম পাগল। আসলে এই পাগল শব্দটিই যে সিনেমার মুখ্য বিষয় বোঝা যায় যখন স্যাম ঘোষণা দেয় রুবির একটি ছবি দেখে সে সুদূর ভবিষ্যত থেকে বর্তমানে চলে এসেছে। ভালবাসার জন্য এক সময় থেকে অন্য সময়ে যাওয়া নতুন কিছু নয়। সামহোয়ার ইন টাইম বা টাইম আফটার টাইম চলচ্চিত্রেও আমরা এরকম দেথেছি। কিন্তু হ্যাপি এ্যাকসিডেন্ট সিনমোটি নাটক বা অভিযানের চেয়ে রোমান্টিক কমেডি ধাচেঁ তৈরী হয়েছে। রুবিকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে স্যাম কী বাস্তব নাকি শুধুই আরেক ব্যর্থ প্রেমিক।আর এভাবেই সূত্র ধরে পেছনে যেতে যেতে স্যামের আসল কাহিনী বের হয়ে আসে। এখানেও ভালবাসা সাইন্স ফিকশন সিনেমার পার্শ্বকাহিনী না হয়ে কাহিনীর মূল চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে। প্রেমের সিনেমাগুলোতে প্রথমে নায়ক-নায়িকার দেখা হয় , তারপর বিচ্ছেদ আর শেষ পর্যন্ত মেয়েটির মন জিতে নেয় ছেলেটি। কিন্তু সাইন্স ফিকশন মুভিগুলোর উপাদানগুলো খুব ভেবেচিন্তে যে করা তা নয়, যেমন নকড আপ সিনেমায় অশালীন কৌতুকগুলো এমনভাবে ব্যবহার করা হয়েছে যাতে সব দর্শক প্রেমের কাহিনীটাকে গ্রহন করে। হ্যাপি এ্যাকসিডেন্ট মুভিতে টাইম মেশিন আর এর ধাঁধা নিয়ে অনেক মজা করা হয়েছে। আর রোমান্টিক কমেডি এবং সাইন্স ফিকশন মুভি দুইভাবেই এটা দশর্কদের সন্তুষ্ট করেছে।

বেশিরভাগ সাইন্সফিকশনের (ভালো অথবা মন্দ) গল্পগুলোতে আসলে কোনা না কোনভাবে মানবতার দিকগুলোই তুলে ধরা হয়। সাইন্সফিকশন ফিল্মে প্রেম কেন?- এই প্রশ্ন না করে বরং কেন প্রেম-ভালবাসা নিয়ে আরো বেশি বেশি সাইন্সফিকশন চলচ্চিত্র তৈরী হয়না, সেটাই প্রশ্ন হওয়া উচিত।

সূত্র:clarkesworldmagazine.com

© 2016. www.oncinemabd.com | Editor & Founder Bidhan Rebeiro | oncinemabd@gmail.com | C: www.bidhanrebeiro.wordpress.com