সিনেমা কেন দেখি না

প্রাসঙ্গিক রচনা

বুদ্ধদেব বসু

বুদ্ধদেব বসু(বুদ্ধদেব বসু জন্মেছেন ১৯০৮ সালের ৩০ নভেম্বর, মারা যান ১৯৭৪ সালের ১৮ মার্চ। বাংলা ভাষার খ্যাতিমান এই সাহিত্যিক একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার, গল্পকার, অনুবাদক, সম্পাদক ও সমালোচক। গেল শতাব্দীর বিশ ও ত্রিশের দশকে তাঁর হাত ধরে নতুন কাব্যরীতির সূচনা হয়। তাই আমরা মনে করি বুদ্ধদেব বসুর চলচ্চিত্র ভাবনা কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ‘সিনেমা কেন দেখি না’ শিরোনামে এই ছোট রচনায় চলচ্চিত্রের প্রতি বিদ্বেষই চোখে পড়ে। যেমন সিনেমা সংক্রান্ত আলাপ বসুর কাছে ‘কান ঝালাপালা’র সমান, উন্মত্ত এক আমোদ। চলচ্চিত্র মানে বুদ্ধদেব বসুর কাছে ‘অপরিণত কাঁচা মনের উপভোগ’। বুদ্ধদেব বসু যখন কৈশোর ও তারুণ্য পেরিয়ে বয়সের ভারে একটু থিতু হয়েছেন, যখন ‘জ্ঞানবৃক্ষের ফলে কামড় বসিয়েছেন’, তখন চলচ্চিত্র তাঁর কাছে ‘মূঢ়তা’ মাত্র। সত্যি চলচ্চিত্র সম্পর্কে বুদ্ধদেব বসুর এই উপলব্ধি বেশ উপভোগ্য। বসু লেখাটি লিখেছিলেন চিত্রপঞ্জীতে, বাংলা ১৩৪০ সনের শ্রাবণ সংখ্যায়। রচনাটি পুন:মুদ্রিত হয়েছে দেবীপ্রসাদ ঘোষের সংকলিত ও সম্পাদিত ‘বাংলাভাষায় চলচ্চিত্রচর্চা: ১৯২৩-৩৩, প্রথম খণ্ড’ থেকে। গ্রন্থটি কলকাতার প্রতিভাস থেকে প্রকাশ পায় ২০১১ সালে। প্রায় দুর্লভ এই লেখাটি oncinemabd এর জন্য কম্পোজ করে দিয়েছেন আয়েশা আক্তার। -সম্পাদক)
-------------------------------------------------------
বাসে আর ট্রামে- বিশেষ করে বাসে- যে সব বিষয়ে লোকে আলাপ করে তার মধ্যে ফুটবলের স্থান ওপরে, না ফিল্মের, এ একটা গবেষণার বিষয় বটে। আমার বহুকাল পর্যন্ত ধারণা ছিল নিরীহ, ভদ্র বাস যাত্রীর কান ঝালাপালা আর মন উতলা করবার পক্ষে ফুটবলের মতো কোনো বিযয়ই নেই। কিন্তু এ বছর লক্ষ করছি-বাঙালি টিমের একটানা মাঝামাঝিত্ব কী উদয়শঙ্ককর কী অন্য যে-কোনো কারণেই হোক- এ বছর যেন আমাদের ফুটবল উৎসাহ একটু হ্রাস পেয়েছে । আজকাল বাসে যেতে-যেতে যদি দশবার গ্রিটা গার্বে আর রনাল্ড কোলম্যান শুনি (ক্ষমা করুন, নতুনতম তারাদের নাম একটাও মনে পরছে না ) তো হামিদ আর গোষ্ঠ দু-বারও নয়। এই ডেমক্রাসির যুগে একটা সংঘবদ্ধ আমোদকে জায়গা ছেড়ে দিতে হচ্ছে অধিকতরো , উন্মত্ততরোরূপে সংঘবদ্ধ অন্য-এক আমোদের কাছে।
সেদিন বাসে যাচ্ছিলুম- আমার পিছনের বেঞ্চিতে দুটি ছেলে সেই চিরন্তন ফিল্ম আলাপ করছিল। কথায়-কথায় শুনতে পেলুম, একজন বলছে:
’চণ্ডীদাস কেমন হয়েছে, সত্যি? ’
’সে কী! চণ্ডীদাস তুই দেখিসনি? এ-ক-বা-র-ও ন-য়? ’
’অত্যন্ত কুণ্ঠিত স্বরে উত্তর হল: না, এখন পর্যন্ত... ’
’তোর লজ্জা করে না মুখ দেখাতে? চণ্ডীদাস দেখিসনি এখন পর্যন্ত।’
আমি নিজেকে সম্বরণ করতে পারলুম না, প্রায় নিজেরই অজান্তে আমার মাথাটা ঘুরে গেল সেই বাঙালি যুবকের মুখ একবার দেখতে, এখন পর্যন্ত যে চণ্ডীদাস দ্যাখেনি।
দ্যাখ দ্যাখ, অন্য ছেলেটি জয়দৃপ্ত স্বরে বলে উঠল, এই ভদ্রলোকও অবাক হয়ে তোকে দেখছেন। চণ্ডীদাস দ্যাখেনি, এমন আর-একটা লোক বার কর তো কলকাতা শহরে।
ভয়ে, লজ্জায় আমি তাড়াতাড়ি মুখ ঘুরিয়ে রাস্তার দিকে তাকালুম। ওঃ, ভাগ্যিস কে কী ফিল্ম দেখেছে আর না দেখেছে, তা তার পিঠের ওপর লেখা থাকে না। আমার পিঠের ভাবখানাকে আমি এমন করে তোলবার চেষ্টা করলুম যেন- চণ্ডীদাস তো চণ্ডীদাস, উমাশশী সকালে উঠে চায়ের সঙ্গে কী খান, দুর্গাদাস তাঁর চুলে কী তেল মাখেন- সেসব সংবাদ রোজ আমার কাছে টেলিফোনে পৌঁছোয়।
বুদ্ধিমান পাঠক নিশ্চয়ই এতক্ষণে বুঝতে পেরেছেন যে, চণ্ডীদাস আমি দেখিনি। দেখিনি যে, সেটা যদি আশ্চর্যের হয়, তার চেয়েও আশ্চর্যের এই যে, দেখার ইচ্ছেও কখনও হয়নি।
কিন্তু আশ্চর্যই বা কী? ফিল্ম জিনিসটাই অপরিণত কাঁচা মনের উপভোগ :যার মন বয়ঃপ্রাপ্ত হয়েছে সে ও থেকে নিছক ক্লান্তি আর বিরক্তি ছাড়া কিছুই পেতে পারে না। তবে পৃথিবীর বেশির ভাগ লোক ঐতিহাসিক হিসেবে বড়ো হয়ে উঠলেও তাদের মনের নাবালকত্ব কখনও ঘোচে না- এই যা। জাগ্রত বুদ্ধি লোকের জন্য ফিল্ম যে তৈরি হতে পারে না তা নয়-হয়েও থাকে। কিন্তু তার সংখ্যা এত -ওঃ, এত কম! গোল্ড রাশ, কি হেলস এঞ্জেলসের মতো ছবি বছরে একটাও তৈরি হয় না।
একদা আমারও দিন ছিল। একদিন আমিও হলিউড থেকে চালান টিনের আমোদ গিলতুম গোগ্রাসে। একবার রাস্তায় একটা সিকি কুড়িয়ে পেয়েছিলুম (আমার প্রতি ভাগ্যের একমাত্র দয়া!); মুহূর্তকাল দ্বিধা না-করে তা নিয়ে সোজা চলে গেলুম সিনেমায়। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার পর এক খণ্ড রঘুবংশ চার আনায় বেঁচে ছবিঘরের স্বর্গোদ্যানে প্রবেশের মাশুল জোগালুম। কত পয়সা যে মার বাক্স থেকে চুরি করেছি .... যে সব ছবি দেখবার জন্যে, তাদের নাম শুনলে আজকালকার ছেলেমেয়েরা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকবে মুখের দিকে। হায়রে, আমার সময়ের সেই ছবি স্বর্গের দেবদেবীরা -তারা কোথায় মহাবীর এডি পলো, কোথায় ক্ষীনতনু, আত্মাময়ী লিলিয়ান গিশ? কোথায়? Where are the snows of yester-year?
কিন্তু মানুষের নিয়তিই এই যে, কোনো স্বর্গ তার কপালে টিকে থাকবে না। আমিও ভ্রষ্ট হলাম সেই রহস্যছায়াময় (তখনও ধ্বনিময় হয়নি) স্বর্গ থেকে। সে- মুহূর্তে বেরিয়ে এলুম কৈশোরের গোধূলি থেকে- হায়, আত্মাকে যে জিনিস গভীর পরিতৃপ্তি দিত, তার মধ্যে অসহ্য মূঢ়তা ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেলুম না। চোখের দৃষ্টিই গেছে বদলে। জ্ঞানবৃক্ষের ফলে কামড় বসাবার শাস্তি অনেক ও বিচিত্র!
একটি ছেলেকে চিনি, তার বয়স সতেরো হবে কি আঠারো। এক ছবিঘর থেকে আর এক ছবিঘরে আসা-যাওয়া নিয়ে তার জীবন, হলিউডের নক্ষত্রপুঞ্জের নামের নামতা তার মুখস্থ। মাসের পর মাস আমি কোনো ছবি দেখতে যাইনে শুনে সে এমনভাবে আমার দিকে তাকায় যেন আমি সদ্য বন -থেকে ধরে আনা কোনো কিম্ভূত-গোছের জীব। একদিন সে এসে আমাকে বললে, একটা গর্জাস ছবি এসেছে- এটা যদি না দেখেন, আপনার জীবনই বৃথা।
নিয়ে গেল আমাকে একরকম জোর করে সেই জীবন সার্থক-করা ছবি দেখতে। ছবির নাম হুপী। স্বীকার করতেই হবে হুপী হলো জীবনের একটা অভিজ্ঞতা। তখন বিশুদ্ধতম বর্বরতা আজকালকার এই আমেরিকান সভ্যতার যুগেও কালেভদ্রে মেলে। এই জাতীয় ফিল্ম দেখেই আমরা নিষ্ঠুর নিশ্চয়তায় উপলব্ধি করতে পারি, পৃথিবীটা কী দ্রুতগতিতে জাহান্নামের দিকে এগোচ্ছে।
কিন্তু পৃথিবীর কথা ভেবে মন খারাপ করে লাভ কী বলুন; নিজেরই ভাবনার শেষ নেই।

চিত্রপঞ্জী; শ্রাবণ, ১৩৪০
*চণ্ডীদাস(নিউ থিয়েটার্স) সবাক চিত্র, চিত্রা সিনেমায় মুক্তি পায় ২৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৩২ সালে। পরিচালক- দেবকীকুমার বসু। অভিনয়ে- দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, অমর মল্লিক, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, কৃষ্ণচন্দ্র দে, উমাশশী, সুশীলা প্রমুখ।

© 2016. www.oncinemabd.com | Editor & Founder Bidhan Rebeiro | oncinemabd@gmail.com | C: www.bidhanrebeiro.wordpress.com