রোমান্টিক কমেডি- চশমে বদ্দুর

সিনেমা আলোচনা

সাজ্জাদ কবীর

Imageএকটা নিটোল প্রেমের কাহিনি বললেও অত্যুক্তি হতো না। কিন্তু পুরো সিনেমার বাঁকে বাঁকে যে উপকরণ ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে তা এই সিনেমাকে এনে দিয়েছে অন্য এক মাত্রা। সেই মাত্রার জন্যই “চশমে বদ্দুর” সাই পরানজাপির এক অনন্য সৃষ্টি। চলচ্চিত্রকার হিসাবে সাই পরানজাপির স্থান আরও সুদৃঢ় করেছে এই চলচ্চিত্র। তাঁর পদ্মশ্রীর মত রাষ্ট্রীয় পুরষ্কার পেতে এই একটি সিনেমাই যথেষ্ট। আলোচ্য সিনেমায় হাস্যরসের উপাদান ও অতি নাটকিয়তা আছে, তারপরও বলব এই ছবি জীবন ঘেঁষা।
তিন বন্ধু দিল্লিতে থাকে পড়াশোনার জন্য। তিন তলার একটা ঘরে তিন জনের বাস। সিদ্ধার্থের ভূমিকায় ফারুক শেখ, ভালো ছাত্র। এম এ করেছে অর্থনীতিতে, এখন পি এইচ ডি করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। বাকি দুই বন্ধু অমির ভূমিকায় রাকেশ বেদি এবং জমু চরিত্রে অভিনয় করেছেন রবি বিশ্বানি, লেখাপড়ায় বিশেষ মন নেই তার। অমি আছে কবিতা, আর নাটক নিয়ে এবং জমুর শখ সিনেমা। তবে এই দুইজনের মিল- প্রেমিকা খুঁজে বেড়ানোতে। দুই জনেরই আফসোস পুরো দিল্লি ঘুরেও তারা মনের মতো মানুষ খুঁজে পায় না। ওদিকে সিদ্ধার্থ পড়াশোনা নিয়ে এতখানিই মগ্ন যে মেয়েদের কথা সে ভাবেই না। তা ছাড়া বন্ধুদের মত মেয়েদের পিছনে ঘুরে মনের মানুষ খোঁজা তার কাছে ছেলেমানুষী। এমন মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও তারা ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
প্রথম দৃশ্যেই দেখা যায় সিগারেট পান করছে তিনজন। আর্থিক সংকটের সময় তারা এক সিগারেটই ভাগজোখ করে খায়। এখানে দেখা যায় একজন সিগারেট কিছুটা টেনে অন্যজনকে দেয় তারপর দ্বিতীয় জন কয়েক টান দিয়ে সেটা চালান করে দেয় একটা পায়ের আঙুলের ফাঁকে। পা মুখের সামনে আনলে দেখা যায় পায়ের মালিক বই পাঠরত সিদ্ধার্থ। সিগারেটের ছাইদানি ভর্তি হয়ে যেতে অমি যায় ব্যলকনিতে সেটা খালি করতে। তিন তলা থেকে সে দেখতে পায় নিচে রাস্তা দিয়ে এক মেয়ে হেঁটে যাচ্ছে। উঁচু থেকে ক্যামেরা ধরা। অমি চেঁচিয়ে ডাকাডাকি করে বন্ধুদের। সিদ্ধার্থ ডাকাডাকি আমলে না এনে বই পড়তেই থাকে। দৌড়ে আসে জমু। মেয়েটা অনেক দূরে চলে যায় তাদের কাছ থেকে। আর এই দৃশ্যটাই পুরো সিনেমায় অমি আর জমুর চরিত্র বর্ণনার রূপক দৃশ্য বলা যায়। তাদের বান্ধবী যোগাড় করার সাধনা সব সময় এভাবেই ব্যর্থ হয়ে যায়।
এই ঘটনার পর জমু ছুটে বেরোয় মেয়েটার ঠিকানা যোগাড় করতে। আর তারপর অমি আর জমুর মধ্যে তর্ক লাগে কে হবে নায়ক। দুই জনই চেষ্টা করে তরুণীর মন জয় করতে। কিন্তু তারা কেউই সফল হয় না। ঘরে এসে বিষয়টা চেপে যায় দুজনই। তারা তাদের মনগড়া সাফল্যের কাহিনি বলে যায়। সত্যকাহিনি এবং তাদের মনগড়া গল্প চিত্রায়ন এতটাই চমৎকার আর এতখানিই হাস্যরসাত্মক যে দর্শক তা বারবার দেখেও বিরক্ত হবে না।
তবে এই পর্যন্ত বলা কাহিনিতে শুধু মূল গল্প না বলে পরিচালক কিছু পার্শ্ব ঘটনাও দেখিয়েছেন। আর সেগুলো এত বাস্তবধর্মী এবং জীবনমুখী যে হাসির মধ্যে দিয়েও উপলব্ধি হবে বাস্তবতার। প্রথম জমু বাসা থেকে বের হয় মেয়েটার ঠিকানা যোগাড় করতে। পথে পড়ে পান-সিগারেট বিক্রেতা লালন মিয়ার চরিত্র সাঈদ জাফরির দোকান। আলাদা করে কাহিনিকার বা পরিচালককে কিছু বলতে হয় না। ছোট্ট একটা দৃশ্যে বোঝা হয়ে যায় এরা বাপের পাঠানো টাকায় দিল্লিতে পড়ে। টাকা-পয়সার টানাটানি লেগেই থাকে। আর লালন মিয়ার দোকান থেকে তারা বাকিতে সিগারেট খায়। শুধু তাই না এই দোকানদার খরিদ্দার সম্পর্কটা নেহায়েতই টাকা-পয়সার মধ্যে সীমাবদ্ধ না। তাদের সাথে অন্য একটা আন্তরিকতা আছে তা এই একটি দৃশ্যেই জানিয়ে দেন পরিচালক। পুরো সিনেমাতেই এরকম কয়েকটি ছোট ছোট দৃশ্য মূল কাহিনির স্তম্ভ হিসাবে দাঁড়িয়ে যায়। যে স্তম্ভগুলো শুধু একটা কমেডি সিনেমা নয় আমাদের উপহার দেয় তৎকালিন মধ্যবিত্ত সমাজের চালচিত্র।
নেহা নামের দীপ্তি নাভালের সাথে পরিচয় হয় সিদ্ধার্থের। নেহা একটা গুড়ো সাবানের বাজার গবেষণার কাজ করছিলো। তার সূত্র ধরে আসে সিদ্ধার্থদের বাসায়। আর এই ভাবেই তাদের পরিচয় এবং পরবর্তীকালে প্রেম। প্রেমের যোগাযোগটাও বেশ মজার। নেহা গান শিখতে যায় এক জায়গায়। সে ইচ্ছা করেই সেটার ঠিকানা এবং সময় বলে সিদ্ধার্থকে। যে সিদ্ধার্থ মেয়েদের প্রতি উদাসিন ছিলো তার মনেও রঙ লাগে নেহাকে দেখে। উপস্থিত হয়ে যায় তাই গানের স্কুলের সামনে।
গানের স্কুল থেকে শুরু করে সিদ্ধার্থের সাথে দেখা হওয়া পর্যন্ত দৃশ্যটি অপূর্ব। গানের শিক্ষকের সাথে চর্চা করা, তারপর সেই গানের রেশ ধরে নায়িকার বেরিয়ে আসা। এমনকি বাস স্টপেজে এসেও তার মনে বাজতে থাকে গানটি। একেবারে যাকে বলে গানের মধ্যে ডুবে যাওয়া সেরকমই এক দৃশ্য। বাস স্টপেজের অন্যরা অবাক হয়ে তাকায় তার গানের তালে তালে হাত-পা নাড়ানো দেখে। কিন্তু নেহার কোনদিকে খেয়াল নেই। এর মধ্যে সিদ্ধার্থ হাজির হয় মোটর সাইকেল নিয়ে। আর সেই গানের মধ্যে দিয়েই দু’জনের নতুন জীবনযাত্রা অর্থাৎ প্রেমের যাত্রা শুরু।
এই দৃশ্যে একটাই খটকা। কিছুটা দূর থেকে হেলমেট পরা সিদ্ধার্থকে এক দর্শনেই চিনে ফেলা। এর আগে তাকে একবারই দেখেছে নেহা। সাধারণত অতিচেনা লোককেও হঠাৎ হেলমেট মাথায় দেখলে চেনা যায় না। তবে প্রেম বলে কথা, এবং নাটকিয়তা একটু থাকতেই পারে।
এরপর যেটা ঘটে সেটা এই সিনেমার এতক্ষণ দেখানো দৃশ্য থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এই জায়গায় এসে নায়কের বাকি দুই বন্ধু আবিষ্কার করে তাদের সেই স্বপ্নের নায়িকার সাথেই প্রেম চলছে বন্ধু সিদ্ধার্থের। তারা স্বাভাবিকভাবে সেটা নিতে পারে না। বিশেষ করে তাদের ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়টাই কাজ করে বেশি। তারা সিদ্ধার্থকে নেহা সম্বন্ধে উল্টোপাল্টা কথা বলে সম্পর্কে ফাটল ধরায়। নায়ক নায়িকার মুখ দেখাদেখি বন্ধ। নি:সন্দেহে করুণ ব্যাপার। কিন্তু এখানেই কাহিনিকার এবং পরিচালকের মুন্সিয়ানা। এই সময়টাকেও সিনেমায় এমন ভাবে চিত্রায়ন করা হয়েছে বা এর মাঝে মাঝে এমন ছোট ছোট ঘটনা (স্কিড) ঢোকানো হয়েছে যে কোনভাবেই কেউ এটাকে কমেডি সিনেমা না ভেবে পারবে না। তবে বিরহ চলাকালে আরেকটা গানের দৃশ্য থাকে গানের স্কুলে। একটা গান দিয়ে যেমন প্রেমের শুরু হয়েছিল তেমনি আরেকটি গানের চমৎকার ব্যবহার করে বোঝানো হয়েছে বিরহটা। হৈমন্তি শুক্লার গলায় গানটা সত্যিই বিরহের আবহ সৃষ্টি করে।
কমেডি সিনেমার চরিত্র অনুযায়ী একটা মিলনাত্মক পরিণতি হবে সেটাই স্বাভাবিক। তবে শেষ পর্যন্তই এটাকে কমেডির তুঙ্গে রাখতে পেরেছেন কাহিনিকার।
এই সিনেমায় নেহার দাদীর চরিত্রে ছিলেন লীলা মিশ্র। নেহার বাবার চরিত্রে অভিনয় করেছেন বিনোদ দোশি। এছাড়া অমিতাভ বচ্চন এবং রেখা একটা কল্পিত সিনেমার দৃশ্যে অভিনয় করেছেন।
সিনেমার একটি দৃশ্যে চিত্র সম্পাদনায় একটু সমস্যা হয়েছে বলে মনে হয়েছে। যে দৃশ্যে জমু নায়িকার সাথে কল্পিত অভিসারের কাহিনি বলে সমস্যাটা তখনকার। যেহেতু জমু সিনেমা পাগল মানুষ তাই তার কল্পনার গল্পও হয় সিনেমা নিয়ে। নায়িকাকে নিয়ে সে ডেটিঙে বেরিয়ে কী কী করেছে তার বর্ণনা দেয় বিভিন্ন পরিচিত সিনেমার দৃশ্য দিয়ে। প্রকৃত ঘটনায় সে যে নেহার ভাইয়ের হাতে ধোলাই খায় সেটা ঢাকতে একটা সিনেমার মারামারির দৃশ্য বর্ণনা করে। এবং স্বাভাবিক ভাবে এখানেই ডেটিং শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু এর পরেও অন্য একটা সিনেমার দৃশ্যে সুস্থ দেহে অভিনয় করতে দেখা যায়। সম্ভবত এই জায়গায় দৃশ্য দুটো একটু এদিক-সেদিক হয়ে গেছে।
৩০ এপ্রিল ১৯৮১ সালে হিন্দি ভাষার এই সিনেমাটি ভারতে মুক্তি পায়। ১৪৫ মিনিটের রঙিন এই সিনেমার সাউন্ড মিক্স “মনো”। সিনেমার কাহিনিকার এবং পরিচালক সাই পরানজাপি। এটার সঙ্গীত করেছেন রাজ কমল। সিনেমাটোগ্রাফি বিরেন্দ্র সাহনী।

© 2016. www.oncinemabd.com | Editor & Founder Bidhan Rebeiro | oncinemabd@gmail.com | C: www.bidhanrebeiro.wordpress.com