চলচ্চিত্রে ফুটবল

সিনেমা আলোচনা

ফাহিম ইবনে সারওয়ার

Imageবাঁশিতে ফু

২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপ নিয়ে পুরো বিশ্ব এখন মাতোয়ারা। ফুটবল প্রেমীদের উন্মাদনা চোখে পড়ছে জার্সি, পতাকা আর নানা অনুষঙ্গের মাঝে। কিন্তু ফুটবল ও চলচ্চিত্র এই উভয়ের ভক্ত যারা তারা নিশ্চয় ফুটবল চলচ্চিত্র উপভোগ করেন দ্বিগুণ উৎসাহে। তাদের জন্যই বিশ্বখ্যাত সব চলচ্চিত্রের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দেয়া হয়েছে এই লেখায়। আর ফুটবল নিয়ে নির্মিত এশিয়ার কয়েকটি চলচ্চিত্রও থাকছে এই আয়োজনে।

খেলা শুরু

প্রথমে জানাবো ট্রিলোজির কথা। মানে একই সিরিজের তিনটি ছবি! ফুটবল নিয়ে যতো ছবি হয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছবি বোধ হয় গোল-ট্রিলোজি। শুধু মাঠের ফুটবল নয়, মাঠের বাইরের খেলা, রাজনীতি, উত্থান-পতন, ড্রেসিং রুমের হতাশা কিংবা উৎসব, ফুটবল তারকাদের বিলাসবহুল জীবন, স্বপ্ন থেকে বাস্তব সবকিছুই উঠে এসেছে গোল ট্রিলোজিতে। ফুটবল ফ্যানদের জন্য এই সিনেমাকে বলা যায় কমপ্লিট প্যাকেজ! একবার শুরু করলে তিনটে সিনেমা না দেখে উঠতেই পারবেন না। গোল সিরিজের প্রথম মুভি গোল : দ্য ড্রিম বিগিনস মুক্তি পায় ২০০৫ সালে। দ্বিতীয় ছবি গোল টু : লিভিং দ্য ড্রিম মুক্তি পায় দু’বছর পর ২০০৭ সালে। তার দুবছর পর ২০০৯ সালে মুক্তি পায় সিরিজের শেষ ছবি গোল থ্রি : টেকিং অন দ্য ওয়ার্ল্ড।

Imageগোল : দ্য ড্রিম বিগিনস

গোল সিরিজের প্রথম ছবিটির নির্মাতা ড্যানি ক্যানোন। এই ছবিতে আমেরিকার লস অ্যাঞ্জেলেসের স্প্যানিশ কলোনীতে বসবাসরত সান্তিয়াগো মুয়েঞ্জের জীবনের শুরুর দিককার ঘটনাবলী তুলে ধরা হয়েছে। সান্তিয়াগো একজন প্রতিভাবান ফুটবলার। তার ধ্যানজ্ঞান সবই ফুটবল নিয়ে। একজন পেশাদার ফুটবলার হতে চায় সে। কিন্তু যেখানে নুন আনতে পান্তা ফুরায় সেখানে তার স্বপ্ন কিভাবে সত্যি হবে! একটি চায়নিজ রেস্টুরেন্টে কাজ করে তার বাবাকে সাহায্য করে সে। পেশায় তার বাবা একজন মালি। স্থানীয় গাড়ির গ্যারেজের একটি ফুটবল টিমের হয়ে খেলে সান্তিয়াগো। সে যে সত্যিকারের ভালো ফুটবলার সেটা বুঝতে পারে গ্যারেজের এক কর্মী গ্লেন ফয়। একসময় ইংল্যান্ডে নিউক্যাসল ইউনাইটেড টিমের হয়ে খেলেছে সে। সান্তিয়াগোর স্বপ্নের পালে হাওয়া লাগায় ফয়। নিজের পুরোনো বন্ধুদের সুবাদে সান্তিয়াগোকে নিউক্যাসেলের দরোজা পর্যন্ত নিয়ে যায় সে। কিন্তু ব্রিটিশ পরিবেশে মাঠে খাপ খাইয়ে নিতে পারেনা সান্তিয়াগো। নিজেকে প্রমান করার জন্য এক মাস সময় পায় সে। এই সময়ে গ্লেন তাকে ট্রেইনড করে তোলে যে কোন পরিবেশে যে কোনো মাঠে খাপ খাইয়ে নেয়ার মতো করে। এরই মাঝে ক্লাবের নার্স রজ হার্মিসনের প্রেমে পড়ে সান্তিয়াগো। সাবস্টিটিউট হয়ে দলের জন্য মাঠে নেমে গোল করলেও সবার নজরে আসতে পারেনা সান্তিয়াগো। এদিকে লস অ্যাঞ্জেলেসে মারা যায় তার বাবা। লস অ্যাঞ্জেলেস ফিরে যাবে বলে ঠিক করে সে। কিন্তু এয়ারপোর্ট থেকে ফিরে আসে স্বপ্নকে জয় করার জন্য। দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করে লিভারপুলের বিরুদ্ধে মাঠে নামার সুযোগ পায় সান্তিয়াগো। টানটান সে ম্যাচে সান্তিয়োগের দারুন নৈপুন্যে ৩-২ গোলে ম্যাচ জিতে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে জায়গা করে নেয় তার দল নিউক্যাসল। স্বপ্ন ছুয়ে যাবার সে মুহূর্তে সান্তিয়াগো জানতে পারে তার প্রথম ম্যাচটি দেখে গিয়েছিলো তার বাবা। জীবনের প্রথমক জয়টি সান্তিয়াগো তার বাবাকেই উৎসর্গ করে।

ছবিটিতে সান্তিয়াগোর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন কুনো বেকের। গ্লেন ফয় এর ভূমিকায় স্টিফেন ডিলান এবং সান্তিয়াগোর বান্ধবী এবং ক্লাবের নার্সের ভূমিকায় আন্না ফ্রিয়েল অভিনয় করেছেন। এছাড়াও ছবিটিতে অতিথি চরিত্রে অভিনয় করেছেন স্বয়ং ডেভিড ব্যাকহাম।

Imageগোল টু : লিভিং দ্য ড্রিম

গোলের ব্যাপক সাফল্যের ধারাবাহিকতায় মুক্তি পায় ছবিটির সিক্যুয়াল গোল টু : লিভিং দ্য ড্রিম। কাহিনীর ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এখানে সান্তিয়াগোর ক্লাব লাইফ দেখানো হয়। ক্লাবে নামকরা সব ফুটবল তারকাদের সাথে দেখা হয় তার। কখনো তাদের পক্ষে, কখনো তাদের বিপক্ষে মাঠে নামে সে। জুয়েম কোলেট-সেরা পরিচালিত ছবিটি ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইংল্যান্ডে এবং ২০০৮ সালের আগস্টে আমেরিকায় মুক্তি পায়। ছবির মূল চরিত্র সান্তিয়াগোর ভূমিকায় কুনো বেকের-ই অভিনয় করেন। তার সাথে বিভিন্ন চরিত্রে আরও অভিনয় করেন আলেসান্দ্রো নিভোলা, আন্না ফ্রিয়েল, স্টিফেন ডিলান। ডেভিড ব্যাকহাম, রোনালদো, রিভালদো, রবার্তো কার্লোস, সার্গেই রামোসসহ সে সময়কার প্রায় অর্ধশত ফুটবল স্টার এই ছবিতে নিজেদের ভূমিকায় অতিথি চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন।

Imageগোল থ্রি : টেকিং অন দ্য ওয়ার্ল্ড

গোল সিরিজের সর্বশেষ ছবি গোল থ্রি : টেকিং অন দ্য ওয়ার্ল্ড। তবে মজার বিষয় হচ্ছে ছবিটি বাণিজ্যিকভাবে কোনো সিনেমা হলে মুক্তি পায়নি। ২০০৯ সালের ১৫ জুন ইংল্যান্ডে মুক্তি পায় সিনেমাটির ডিভিডি। ক্লাব ফুটবল ছেড়ে এই ছবি উঠে আসে বিশ্বকাপের মাঠে। ছবির কাহিনী আবর্তিত হয়েছে ২০০৬ সালে জার্মানিতে অনুষ্ঠিত ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ নিয়ে। ছবিটির মূল চরিত্র সান্তিয়াগো এখানে তার দেশ মেক্সিকোর হয়ে খেলে। ওয়ার্ল্ড কাপের বিভিন্ন দৃশ্য চিত্রায়নের জন্য মাঠে এবং মাঠের বাইরে প্রায় শতাধিক তারকা ফুটবলার নিজের চরিত্রে পর্দায় হাজির হয়েছেন। অ্যান্ড্রু মোরাহান পরিচালিত ছবিটিতে আগের মতোই সান্তিয়াগোর ভূমিকায় বহাল থাকেন কুনো বেকের। এছাড়াও তার সাথে অভিনয় করেন জেজে ফিল্ড, লিও গ্রেগরি, নিক মোরান এবং তামের হাসান।

Imageধান ধানা ধান গোল!

ধান ধানা ধান গোল! ২০০৭ সালের বলিউড ফিল্ম। জন আব্রাহাম, বিপাশা বসু, আরশাদ ওয়ার্সি এবং বোমান ইরানি অভিনীত ছবিটি পরিচালনা করেন বিবেক অগ্নিহোত্রি। আর ইউটিভি মোশন পিকচার্সের পক্ষে ছবিটি প্রযোজনা করেন রনি স্ক্রওয়ালা। ছবির কাহিনীতে নতুনত্ব না থাকলেও ফুটবল নিয়ে বলিউডে কম ছবি থাকায় এটি আলোচিত হয়। যদিও ছবির প্রেক্ষাপট ইংল্যান্ড। সেখানে বসবাসরত ভারতীয়দের নিয়ে তৈরি ছবির কাহিনী। বক্স অফিসেও খুব একটা ভালো করতে পারেনি ছবিটি, তবে জন-বিপাশা সেসময়কার আলোচিত জুটি হিসেবে ছবিতে নজর কাড়েন। দুটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে আরশাদ ওয়ার্সি এবং বোমান ইরানিও তাদেও যোগ্যতার প্রমান রাখেন। জাভেদ আখতারের কথায় প্রিতমের সুরে জনপ্রিয় হয়েছিলো ছবির সাউন্ড ট্র্যাকগুলো। ছবিটির চিত্রনাট্য যৌথভাবে লিখেছেন অনুরাগ কাশ্যপ, বিক্রমাদিত্য মোটওয়ানে এবং রোহিত মালহোত্রা।

Imageশাওলিন সকার

হংকংয়ে নির্মিত ছবি শাওলিন সকার। ২০০১ সালের ছবিটি একটি কমেডি ছবি। ছবিতে একইসাথে অভিনেতা, পরিচালক এবং চিত্রনাট্যকার হিসেবে কাজ করেছেন স্টিফেন চ্যাও। এই ছবির মতো ফুটবল আর কোথাও দেখতে পাবেন না। কারণ এখানে মার্শাল আর্টের মাধ্যমে খেলা হয়েছে ফুটবল। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে ফুটবলের কেরামতির চেয়ে কুংফংর ভেলকি হয়ে উঠেছে উপভোগ্য। মার্শাল আর্টের নানা কসরত আর ফুটবলের নান্দনিকতা মিলে নির্ভেজাল এক বিনোদন ককটেল তৈরি করেছেন পরিচালক। কখনো ফুটবল তাই আকাশে ওড়ে আবার কখনো পুরো গোলবার জুড়ে উড়তে দেখা যায় গোল কিপারকে। বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন একদল দক্ষ মার্শাল আর্ট শিল্পী এখানে কাজ করেছেন। তবে ছবিটিকে বাস্তব করে তুলতে রয়েছে দুর্দান্ত কিছু স্টান্ট। এছাড়াও ভিজ্যুয়াল এফেক্টেসের কাজে ভরপুর ছবিটি। ফুটবল এবং মার্শাল আর্টের মিশ্রনে এক জমজমাট স্পোর্টস মুভি বলা চলে একে। দর্শকরা এরকম বিনোদন আর কোথাও পাবেন না। ২০০৮ সালে ছবিটির একটি সিক্যুয়ালও করেছিলেন এর পরিচালক। কিন্তু শাওলিন সকারের মতো তেমন আলোচনায় আসেনি সিক্যুয়াল শাওলিন গার্ল।

Imageএস্কেপ টু ভিক্টোরি

ফুটবল নিয়ে কমেডি যেমন হয়েছে, হয়েছে রাজনীতিও। ফুটবলের রাজনীতি এক, আবার রাজনীতির ফুটবল আরেক ধরণের। থিওরিটিক্যাল কথাবার্তা মনে হচ্ছে? এস্কেপ টু ভিক্টোরি বা ভিক্টোরি ছবিটি দেখলেই সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে! ফুটবলকেও যে কখনো কখনো রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে সেটি অকপটভাবে উঠে এসেছে ছবিটিতে। ১৯৮১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিটিতে অভিনয় করেছেন সিলভেস্টার স্ট্যালোন, মাইকেল কেইন, ম্যাক্স ভন সিডো এবং ড্যানিয়েল মাসেই। ইয়াবো ইয়াবলোনস্কির চিত্রনাট্যে ছবিটি পরিচালনা করেছেন জন হুস্টন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান বাহিনীর কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে থাকা যুদ্ধবন্দীদের সাথে জার্মান জাতীয় ফুটবল দলের একটি ফুটবল ম্যাচের আয়োজন করা হয়। ক্যাম্পের দু:সহ বন্দী জীবনে অতিষ্ট হয়ে ওঠা প্রত্যেকটি বন্দী যেন ফুটবল ম্যাচটাকে একটি যুদ্ধ এবং মাঠকে যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে নেয়। বন্দীজীবনে ফুটবল হয়ে ওঠে তাদের বিপ্লবের একমাত্র অস্ত্র, খেলার সাথে রাজনীতি মিলে তাই তৈরি হয় অনবদ্য এক সিনেমা। মুক্তির পর থেকে আজও ছবিটি বিভিন্নমহলে দারুনভাবে প্রশংসিত হয়েছে। অন্যসব ফুটবল সিনেমার মত এখানেও সেসময়কার বেশ কয়েকজন সুপাস্টার ফুটবল তারকা অভিনয় করেছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো পেলে, ববি মুর, ওসভালদো আর্দিলস এবং কাজিমিয়েরেজ ডেইনা। দ্বাদশ মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছিলো ছবিটি।

Imageদ্য ডেমড ইউনাইটেড

২০০৯ সালের ব্রিটিশ স্পোর্টস ফিল্ম দ্য ডেমড ইউনাইটেড। ডেভিড পিসের একই নামের বেস্ট সেলার বই থেকে ছবিটির চিত্রনাট্য করেছেন পিটার মরগান। টম হুপার পরিচালিত চলচ্চিত্রটিতে একজন ফুটবল টিম ম্যানেজারের গল্প তুলে ধরা হয়েছে। ডেভিড পিস নিজের জীবনের কাহিনীতেই কিছুটা নাটকীয় গল্পের প্রলেপ লাগিয়ে লিখেছিলেন বইটি। আর সেখান থেকেই তৈরি হয় ছবিটি। বিবিসি ফিল্মস এবং লেফট ব্যাংক পিকচার্স যৌথভাবে প্রযোজনা করে ছবিটি। স্টিফেন ফ্রিরার্স প্রথমে উপন্যাস অবলম্বনে ছবিটি করার কথা বলেছিলেন। কিন্তু তিনি না করায় ছবিটি পরিচালনার ভার পড়ে টম হুপারের ওপর। ছবিটির বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন মাইকেল শিন, টিমোথি স্পাল, কোলম মিয়ানে এবং জিম ব্রোডেন্ট।

Imageজাগো

আমাদের দেশে খেলা নিয়ে উম্মাদনা থাকলেও সে উম্মাদনা লাগেনি আমাদের চলচ্চিত্রে। খেলাধূলা নিয়ে ছবি খুব কমই নির্মিত হয়েছে আমাদের দেশে। বলতে গেলে স্পোর্টস মুভির আকাল রয়েছে আমাদেও দেশে। সেই আকালেও ভালো একটি ফুটবল চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছিলো ২০১০ সালে। পরিচালক খিজির হায়াত খান নির্মিত ছবিটি তার নান্দনিক পোস্টার এবং শ্রুতিমধুর গানগুলোর জন্য আলোচনায় চলে আসে। সেই সাথে টিম ক্যাপ্টেনের চরিত্রে ফেরদৌস এবং কোচের চরিত্রে তারিক আনাম খানের অভিনয়ও ছিলো বেশ সিনেম্যাটিক। ছবিটিতে আরো অভিনয় করেন বিন্দু, আরেফিন শুভ, নাঈম, রওনক। ছবির সঙ্গীত পরিচালনা করেন অর্ণব। ইন্টারস্পিড প্রোডাকশন্সের ব্যানারে ছবিটি প্রযোজনা করেন সারজিল করিম ও আদনান করিম। ছবির থিম ফুটবল হলেও প্রচন্ডভাবে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে এই ছবি। শিল্পিত চিত্রায়ন ছবিটিকে দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলে।

Imageএগারো

ভারতীয় বাংলা ছবি এগারো। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের এক ঝাক তরুনকে নিয়ে গড়ে উঠেছে ছবির গল্প। এখানেও রাজনীতির সমান্তরালে খেলার অদম্য আগ্রহ এবং দেশপ্রেম তুলে ধরা হয়েছে। ২০১১ সালে ছবিটির মাধ্যমে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে ডেব্যু করেন পরিচালক অরুন রায়। কোলকাতার বিখ্যাত ফুটবল ক্লাব মোহন বাগানের সাথে ব্রিটিশদের ইস্ট ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্টের মধ্যকার ফুটবল ম্যাচ নিয়ে সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে ছবিটি। পুরো ছবি জুড়েই রয়েছে ব্রিটিশ বিরোধী দৃঢ়চেতা বাঙালি আবেগ। ¯্রােতের বিপরীতে দাড় টানার এক অসাধারণ সংকল্প। ১৯১১ সালের ২৯ জুলাই সত্যিকারের ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয়েছিলো এবং সেবারই প্রথম ভারতের স্থানীয় কোন দল ইন্ডিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলো।

Imageবেন্ড ইট লাইক বেকহাম

ব্রিটিশ ফুটবল স্টার ব্যাকহামের নামে সিনেমার নাম হলেও গল্পটি মূলত এক ভারতীয় তরুনীকে নিয়ে। ২০০২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিটি পরিচালনা করেছেন গুরিন্দর চাড্ডা। ভালোবাসা এবং ফুটবল নিয়ে তৈরি ছবিটিতে মূল চরিত্র জেসমিন্দর বা জেসের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন পারমিন্দর নাগরা। তার বান্ধবী জুলসের ভূমিকায় কিরা নাইটলে, কোচ জোর ভূমিকায় জোনাথন রিস মেয়ারস এবং জেসের বাবার ভূমিকায় অভিনয় করেছেন অনুপম খের। আর ছবিতে বেকহাম এসেছেন অনুপ্রেরণা হিসেবে।

ছবির মূল চরিত্র লন্ডনে বসবাসরত ১৮ বছর বয়সী পাঞ্জাবি শিখ তরুনী জেসমিন্দর ভার্মা বা জেস! ফুটবলের প্রতি যার ভালোবাসার শেষ নেই। নিজেও ফুটবল খেলতে চান কিন্তু বাধা আসে রক্ষণশীল পাঞ্জাবি পরিবারের বাবা-মার কাছ থেকে। তাই বাড়ির কাছের পার্কে বন্ধু টনির সাথে খেলে সময় কাটিয়ে দেন। পার্কে ফুটবল খেলার সময় জুলস নামের আরেক নারী ফুটবলার জেসের দক্ষতা দেখে তাকে স্থানীয় প্রমীলা ফুটবল দলের হয়ে খেলার প্রস্তাব দেয়। উৎসাহ বেড়ে যায় জেসের, যোগ্যতার কারণে সুযোগও মেলে। সেখানেই দেখা হয় সুদর্শন কোচ জো’র সাথে। সখ্যতা বাড়ে জেস এবং জুলসের মধ্যে। দুজনেই আবার পছন্দ করে কোচ জোকে। জেসের বাবা-মা যখন বুঝতে পারে জেস তাদের না জানিয়ে ফুটবল খেলছে তখন বাধা দেয় তারা। এদিকে জেস এবং জুলসের দক্ষ জুটির কারণে লীগ টুর্নামেন্টের ফাইনালে পৌঁছে যায় তাদের টিম। জেসের পরিবারকে বোঝানোর দায়িত্ব নেন কোচ জো। জেসের বাবা জানান তিনিও একসময় ক্রিকেট খেলতেন কিন্তু ভারতীয় হবার কারণে বাদ পড়েছিলেন ক্লাব থেকে। সেই থেকে খেলার ওপর তার অভিমান। তিনি চাননা তার মেয়েও কোনদিন তার মতোই কষ্ট পাক। খেলার মাঠে যায়না জেস। তবে বাবার উৎসাহে হাফটাইম পার হবার পর মাঠে ফিরে আসে জেস। জেস-জুলসের জুটি সেকেন্ড হাফে জিতিয়ে দেল দলকে। এদিকে লেখাপড়ার জন্য স্কলারশিপও জুটে যায় জেসের। এয়ারপোর্ট ছাড়ার আগে কোচ জো জেসকে জানায় তার ভালোবাসার কথা। ব্যাস! এর চে মধুর সমাপ্তি তো আর হতে পারেনা।

Imageদ্য ইয়ার মাই প্যারেন্টস ওয়েন্ট অন ভ্যাকেশন

পাঁচবারের ফুটবল বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। ব্রাজিল ফুটবলের ভক্ত ছড়িয়ে রয়েছে সারা বিশ্বে। এবারের ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপের আয়োজক দেশও ব্রাজিল। আর সেই ব্রাজিলে কিনা ফুটবল নিয়ে কোনো ছবি নির্মিত হবেনা!- সেটাতো অসম্ভব। ২০০৬ সালে ব্রাজিলে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি দ্য ইয়ার মাই প্যারেন্টস ওয়েন্ট অন ভ্যাকেশন। পর্তুগীজ ভাষায় নির্মিত ছবিটির চিত্রনাট্য তৈরি করতে সময় লেগেছিলো পাক্কা ৪ বছর। পরিচালক কাও হ্যামবার্গারের সাথে চিত্রনাট্যের কাজে হাত লাগিয়েছেন আদ্রিয়ানা ফালকাও, ক্লডিও গালপেরিন, আন্না মুয়েলার্ট এবং ব্রাউলিও মান্তোভানি। ২০০৭ সালের অস্কারে সেরা বিদেশি ভাষার ছবি বিভাগে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করে ছবিটি। ১৯৭০ সালের ব্রাজিল নিয়ে ছবির গল্প। সাও পাওলোতে বসবাসকারী ১২ বছরের কিশোর মাওরোর বাবা-মা দুজনেই বামপন্থী রাজনীতির সাথে জড়িত। সামরিক সরকারের অভিযানে গা ঢাকা দেয় দুজনই। বাবা-মা ছাড়া একা হয়ে পড়ে মাওরো। আবার সে সময়েই মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ। ব্রাজিল জুড়ে তাই খেলা দেখার উম্মাদনা। সেবারই প্রথমবারের মতো স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সরাসরি ওয়ার্ল্ড কাপ দেখার সুযোগ পায় ব্রাজিলবাসী।

Imageঅফসাইড

পরিশীলিতভাবে গল্প বলার জন্য ইরানি পরিচালকদের খ্যাতি দুনিয়া জুড়ে। গ্ল্যামার না থাকলেও ইরানি ছবিতে থাকে প্রাণ। এবারের বিশ্বকাপে ভালো ফুটবল খেলে বিদায় নেয়া ইরানেও নির্মিত হয়েছে ফুটবলের গল্প নির্ভর ছবি। ২০০৬ সালে মুক্তি পাওয়া ছবিটির নাম অফসাইড। বিখ্যাত পরিচালক জাফর পানাহির ছবিটি খেলা দেখা নিয়ে উম্মাদনার এক অনবদ্য উপাখ্যান। ধর্মীয় অনুশাসনের কড়া নজরদারির ভেতরেও খেলার প্রতি মানুষের ভালোবাসাই ফুটে উঠেছে এই ছবিতে। নিজের মেয়ের গল্প থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে ছবিটি নির্মান করেছিলেন পানাহি। ইরানে খেলা দেখার জন্য মেয়েদের স্টেডিয়ামে প্রবেশ নিষিদ্ধ। কিন্তু খেলা পাগল অনেক মেয়েই পুলিশের নজর এড়িয়ে খেলা দেখার জন্য ছেলে সেজে স্টেডিয়ামে প্রবেশ করে। কিন্তু ধরা পড়ে গেলে স্টেডিয়ামের বাইরে তো যেতেই হবে সাথে শুনতে হবে কড়া কথা। এরকমই কিছু ফুটবল পাগল তরুনীর খেলা দেখার অদম্য ইচ্ছার ছবি অফসাইড। ছবিটি ইরানে চিত্রায়িত হলেও এর প্রদর্শন ইরানে নিষিদ্ধ করে সরকার।

Imageদ্য কাপ

১৯৯৯ সালের ছবি দ্য কাপ। তিব্বতীয় দুই শরণার্থী ভাইয়ের গল্প। সন্ন্যাসী দুই ভাই থাকে ভারতে, হিমালয়ের কোল ঘেষা এক আশ্রমে। ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপ ফুটবল দেখার জন্য একটি টেলিভিশন কেনার জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা করে। পুরো ছবিটির শ্যুটিং হয় ভারতের হিমাচল প্রদেশের বীর গ্রামে। বাস্তবেই গ্রামটিতে তিব্বতীয় শরণার্থীদের বাস। পরিচালক খেন্তসে নোরবু নিজেও তিব্বতের নাগরিক। পরবর্তীতে নিউইয়র্ক ফিল্ম অ্যাকাডেমিতে ফিল্ম নিয়ে পড়াশোনা করেন তিনি। কান চলচ্চিত্র উৎসবের ডিরেক্টরস ফোর্টনাইটে প্রদর্শিত হয় ছবিটি। সুন্দর গল্প এবং নির্মানের জন্য দারুনভাবে প্রশংসিত হয় ছবিটি।

Imageদ্য মিরাকল অব বার্ন

১৯৫৪ সালে সুইজাল্যান্ডের বার্ন শহরে অনুষ্ঠিত হয়েছিলো ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল। সেই ম্যাচে হট ফেভারিট টিম ছিলো হাঙ্গেরি। সেই হাঙ্গেরিকেই ৩-২ গোলে হারিয়ে দিয়েছিলো তখনকার আন্ডারডগ পশ্চিম জার্মানি। সেই ম্যাচটিকে জার্মানরা নাম দেয় : দ্য মিরাকল অব বার্ন। এখনো বার্নের সেই ম্যাচের গল্প জার্মানদের মুখে মুখে প্রচলিত। যেন খেলার এক রুপকথা। একটি জার্মান পরিবারের ভাঙা গড়ার গল্প দিয়ে সিনেমার সূচনা, আর তা শেষ হয় বার্নের স্টেডিয়ামে গিয়ে। বাবা এবং ছেলেদের মাঝে তৈরি হওয়া দূরত্ব ঘোচাতে বার্নের সেই জয় পালন করে সূত্রধরের ভূমিকা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ের প্রেক্ষাপটে নির্মিত ছবিটি এখনো জার্মানির অন্যতম জনপ্রিয় এবং ব্যবসা সফল ছবি হিসেবে বিবেচিত হয়। সোংকে ওর্তমান পরিচালিত ছবিটির প্রিমিয়ারে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন জার্মান চ্যান্সেলর গেরহার্ড শ্রোয়েডারসহ মন্ত্রীসভার বেশ কয়েকজন সদস্য।

Imageরুডো ওয়াই কুরসি

দুই ভাইয়ের ছোটোবেলা থেকে ফুটবলার হওয়ার অদম্য আগ্রহের ছবি রুডো ওয়াই কুরসি। ছন্দময় ফুটবলের জন্য বিখ্যাত ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলো। পেলে-ম্যারাডোনার মতো সেখানকার অনেক কিশোরই ফুটবলার হবার স্বপ্ন নিয়ে বেড়ে ওঠে। সেই স্বপ্নকে সাথে করেই রুডো এবং কুরসি নামের দুই ভাই নিজেদের ছোটো শহর ছেড়ে চলে আসে রাজধানী মেক্সিকো সিটিতে। সেখানেই নিজেদের স্বপ্নকে ছুয়ে দেখার চেষ্টা করে তারা। ছবিটি প্রযোজনা করেছেন থ্রি এমিগোস নামে পরিচিত তিন গুনি মেক্সিকান পরিচালক আলফানসো কুয়ারন, আলেজান্দ্রো গনজালভেস ইনারিত্তু এবং গুইলারমো দেল তোরো। গ্র্যাভিটির জন্য অস্কারজয়ী পরিচালক আলফানসো কুয়ারোনের নাম রেখেছেন তার ভাই এবং ছবিটির পরিচালক কার্লোস কুয়ারন। ২০০৮ সালের মেক্সিকান ছবিটি ফুটবলের চেয়েও সম্পর্কের গল্প হয়ে উঠেছে বেশি। রুডোর চরিত্রে রুপদান করেছেন দিয়েগো লুনা এবং কুরসির চরিত্রে গায়েল গার্সিয়া বার্নেল। ড্রামা এবং কমেডি জনরার ছবিটি মেক্সিকোর সর্বকালের সেরা ব্যবসাসফল ছবির মধ্যে অন্যতম।

খেলা শেষ

ফুটবলের মত পৃথিবীতে ফুটবলই সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। আর সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম চলচ্চিত্রে যখন ফুটবল প্রবেশ করে তখন সেটি হয়ে ওঠে দারুণ দর্শকপ্রিয়। জয় ফুটবল, জয় চলচ্চিত্র। আজকের জন্য এখানেই খেলা শেষ।

© 2016. www.oncinemabd.com | Editor & Founder Bidhan Rebeiro | oncinemabd@gmail.com | C: www.bidhanrebeiro.wordpress.com