ওমেন ইন গোল্ড: স্মৃতির খোঁজে

সিনেমা আলোচনা

আরাফাত পারভেজ

Imageমারিয়া অল্টমান একজন বয়স্ক ইহুদি নারী, থাকেন আমেরিকার লস আঞ্জেলেসে। তবে তিনি আমেরিকান না, জন্মসূত্রে অস্ট্রিয়ান। আমেরিকায় এসেছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পালিয়ে, সোজা কথায় তিনি একজন শরনার্থী। হিটলারের ইহুদি ঘৃণার কথা সবাই জানে। যুদ্ধের সময় তার নাজি পার্টি ইহুদিদের উপর অত্যাচার করেছে, তাদের বাড়িঘর লুটপাট করেছে, যা পেয়েছে তাই কেড়ে নিয়ে গেছে, তার মধ্যে ছিল অসম্ভব মূল্যবান সব পেইন্টিং। ‘ওমেন ইন গোল্ড’ ঠিক এইরকম এক পেইন্টিং।
‘ওমেন ইন গোল্ড’ না বলে বলা উচিত ‘পোর্ট্রেট অফ অ্যাডেলে ব্লখ-বাউয়ার-১’। এই অ্যাডেলে হচ্ছে মারিয়ার আপন চাচী। তার পোর্ট্রেট এঁকেছিল তখনকার বিখ্যাত শিল্পী গুস্তাভ ক্লিমত, ১৯০৭ সালে, যেটাকে পরে ভিয়েনার লোকজন বলত ‘ওমেন ইন গোল্ড’। কারন ছবিটিতে সোনালি দ্যুতির প্রয়োগ ছিল অনিন্দ্যসুন্দর। শিল্পী গুস্তাভ ক্লিমত ছিল তাদের পারিবারিক বন্ধু। মারিয়ার পরিবার ছিল ভিয়েনার অতি সম্ভ্রান্ত পরিবারগুলোর মধ্যে একটি। তাদের যেমন অর্থ ছিল তেমন রুচি ছিল। বিখ্যাত অনেক পেইন্টিং ছিল তাদের পারিবারিক সম্পদ। যুদ্ধের সময় মারিয়া যখন প্রাণ নিয়ে ভিয়েনা থেকে পালিয়ে আসেন তখন পেছনে ফেলে আসেন সবকিছু। তাদের সমস্ত সম্পদ বাজেয়াপ্ত হয়ে যায় নাজি পার্টির হাতে। যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর তিনি গোটা ব্যাপারটা প্রাণপণে ভুলে থাকতে চাইতেন। এটা ছিল তার জন্য তীব্র বেদনাময় একটা ঘটনা, কারন তাকে তার দেশ, পরিবার-পরিজন সবকিছু ত্যাগ করতে হয়েছিল।
কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে?- মারিয়া অল্টমানও বাসেন না। তার কথা হচ্ছে, যা গেছে, তা গেছে- সব বাদ। সব বাদ দিয়ে তিনি ভালই ছিলেন, কিন্তু ঝামেলা বাধাল তার বোন। তাও জীবিত বোন না, মৃত বোন। শেষ বয়সে বোনের মৃত্যুশোক তাকে স্মৃতিকাতর করল। তার মৃত বোনের একটা শেষ ইচ্ছা ছিল সেটা হচ্ছে- আর কিছু না হোক, যদি শুধু তাদের হারিয়ে যাওয়া পেইন্টিংগুলো ফিরে পেত! মারিয়া ঠিক করলেন, তিনি তার সাধ্যমত চেষ্টা করবেন তার বোনের এই ইচ্ছাপূরণের। তিনি তার জন্য ভাড়া করলেন রাণ্ডী শএনবার্গ নামের একজন অল্পবয়স্ক এবং অল্পঅভিজ্ঞ এক আইনজীবী। শুরু হয়ে গেল অনবদ্য এক ধাওয়ার গল্প, তারা দুজন মিলে অসাধ্য সাধন শুরু করলেন ।
চলচ্চিত্রটি সত্য ঘটনার উপর নির্মিত। মূল চরিত্র দুইজন- মারিয়া এবং রাণ্ডী।
রাণ্ডী প্রথমে গোটা জিনিশটা পাত্তা দেয় নি, কোথাকার কোন ছবি, তার উপর বহুবছর আগের কথা, এই জিনিশ পাওয়ার কোনও সম্ভবনা নাই সে জানে। পরে সে যখন দেখল ছবিটা অসম্ভব দামি, তার আগ্রহ বেড়ে গেল। সে নিজে থেকে মারিয়াকে রাজি করাল, দুজন মিলে গেল অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায়। কারণ ছবিটি রাখা আছে ভিয়েনার এক যাদুঘরে। কিন্তু কয়েকদিন দৌড়ঝাঁপ করেই বুঝতে পারল কোনও লাভ নেই। যাদুঘর কর্তৃপক্ষ কোনও ভাবেই এটা হাতছাড়া করবে না, আইনের দিক থেকেও ছবিটি নেয়ার বৈধতা তাদের নেই। কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা ছবিটি কিনেছে, এবং কেনার দলিল আছে তাদের কাছে। দুজনে হতাশ হয়ে ফিরে এলো যুক্তরাষ্ট্রে। কিন্তু এইবার মারিয়া হাল ছেড়ে দিলেও রাণ্ডী ছাড়ল না। সে ঠিকই খুঁজে বের করল আইনের একটা ছোট্ট ফাঁক, যা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসেই এই সমস্যার সমাধান করা যাবে। রাণ্ডী একজন আইনজীবী, সে টাকা ছাড়া কিছু বোঝে না, কিন্তু সে এটা ঠিকই বুঝেছিল যে মারিয়ার কাছে এই ছবির মূল্য অনেক, সেখানে টাকার কোনও সম্পর্ক নেই, সম্পর্কটা হৃদয়ের সাথে যুক্ত। মারিয়ার এই আবেগ রাণ্ডীকে এতই প্রভাবিত করেছিল যে সে চাকরিবাকরি ছেড়ে দিল। অসম্ভব ঝুকি নিয়ে মামলা করে বসল গোটা অস্ট্রিয়ান সরকারের বিরুদ্ধে। সে এবার মরিয়া, কারন সে জানে জীবনে এই প্রথম সে অন্য ধরনের একটি কাজ করছে- অন্য ধরনের কিন্তু সঠিক কাজ। তার জন্য তাকে যতদূর যেতে হয় সে যাবে। সুপ্রিম কোর্টে বিচার শুরু হল কিন্তু শেষপর্যন্ত তারা কি জিততে পারবে? ফিরে পাবে ‘ওমেন ইন গোল্ড’ নামের এই দুর্লভ চিত্র?
চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছেন ব্রিটিশ চলচ্চিত্রকার সায়মন কার্টিস, লিখেছেন আলেক্সি কাম্পবেল। মারিয়া অল্টমানের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন অস্কারজয়ী অভিনেত্রী হেলেন মিরেন আর রাণ্ডীর ভুমিকায় কানাডিয়ান অভিনেতা রায়ান রেনলডস। এরা দুজনেই অত্যন্ত জনপ্রিয় শিল্পী। এছাড়া সঙ্গীত পরিচালকদের মধ্যে আছেন মারটিন ফিপস এবং হান্স জিমারের মতো বিশ্ববিখ্যাত শিল্পীরা। চলচ্চিত্রের চিত্র ধারণ অসাধারণ, পরিচালনা নিবিষ্ট। এখানে জীবনের বৈচিত্র, নিয়তি, আবেগ, প্রচেষ্টা, সত্যান্বেষণ, মূল্যবোধ, ন্যায়বিচার এবং ইতিহাসের সমন্বয় করা হয়েছে খুবই নিখুঁত ভাবে। চলচ্চিত্রটি যে কোনও মানুষকে ভাবাবে।

© 2016. www.oncinemabd.com | Editor & Founder Bidhan Rebeiro | oncinemabd@gmail.com | C: www.bidhanrebeiro.wordpress.com