কথা: আমাদেরই যাপিত জীবনের

সিনেমা আলোচনা

সাজ্জাদ কবীর

রাজারাম যোশি আমাদের এই পচন ধরা সমাজের ‘‘মিসফিট’’ ধ্রুবতারা। তার কার্যকলাপ মোটেই স্মরণযোগ্য কিছু না। তারপরও রাজারাম যোশি আশার প্রদীপ জ্বালে। কেন? সেই বর্ণনাই এখানে দেবো।

চলচিত্রের শুরুটা নাতিকে দাদীর গল্প বলার মধ্যে দিয়ে। গল্পটা আমাদের অতি চেনা খরগোশ আর কচ্ছপের। অ্যানিমেশনের মাধ্যমে দেখানোতে জানা গল্পটা অন্য একটা মাত্রা পায়। আর শুরুতে যদিও পরিশ্রমি কচ্ছপের জয় আর অলস খরগোশের হারের মধ্য দিয়ে দাদী গল্প শেষ করেন পরে সেটা বদলে যায়। আর এই বদলে যাওয়ার গল্প নিয়েই ‘‘কথা’’ নামের চলচ্চিত্র।

রাজারাম থাকে একটা বড় বাড়িতে। ভারতে সেটাকে বলে চাল। মাঝখানে একটা ফাঁকা জায়গার চারদিক ঘিরে তিন-চার তলার একটা বাড়ি। সেটাতে বাস করে অনেকগুলো পরিবার। প্রতি তলার টানা বারান্দা লাগোয়ো এক একজনের বাসা। দুই-তিন কামরার প্রতিটি বাসা যে যার সাধ্য অনুযায়ী সাজিয়ে নিয়েছে। কারোটা আটপৌরে জিনিস দিয়ে সাজান। কারো ছেলে বিদেশে থাকায় ‘‘ইম্পোর্টেড’’ জিনিস দিয়ে ভরা। সেগুলো আবার প্রতিবেশীদের গর্ব ভরে দেখানোর বিষয়ও আছে। আবার রাজারামের মত ব্যাচেলারের বাসায় নেহায়েতই দরকারি কয়েকটা জিনিস। প্রতিবেশীদের সাথে যেমন একটা সুপ্ত প্রতিযোগিতা আছে তেমনি আবার এক জন আরেক জনের সহযোগিতাও করে। অতি সাধারণ এই সব মানুষের আছে আত্মকেন্দ্রিকতা, কিছু যৌথ উদ্যোগ, কিছু সামাজিক লেন-দেন, আবার একে অপরের সুখ-দুঃখের ভাগও নিয়ে থাকে কেউ কেউ। এই লেনাদেনায় কেউ একটু বেশিই নেয় আবার কেউ তুলনামূলক একটু বেশি দেয়। অর্থাৎ সবার লোভ-লালসা বা ওপরে ওঠার প্রতিযোগিতা যেমন আছে, সেই সাথে আছে পারস্পারিক সৌহার্দ্য। অতি সাধারণ এই সব মানুষের আচরণ একেবারেই পৃথিবীর আর দশটা সাধারণ দেশের মানুষের মত। রাজারাম এই জায়গায় অনেকখানি ব্যতিক্রম। তবে বলতেই হয় পরিচালক সাই পরানজাপি তাঁকে মহামানব বানাবার চেষ্টা করেননি। আর এই সিনেমার সার্থকতা এখানেই।

যেহেতু এটা একটা ভিন্ন ধারার চলচ্চিত্র তাই এর খল চরিত্রটিও মোটেও বাজার চলতি হিন্দি ছবির মত না। বাসুদেব রাজারামের পুরানো বন্ধু যে এসে আশ্রয় নেয় এই আস্তানায়। উদ্দেশ্য কিছুদিন অবসর জীবন-যাপন। সে কোথায় ছিল, কোথায় কাজ করেছে এই জিজ্ঞাসা আপনা-আপনিই চলে আসে রাজারামের মনে। তার উত্তরে বাসু যা বলে তার একটাও সত্যি না। সেটা অবশ্য গল্পের প্রথমেই প্রকাশ করে দেয়া হয়। যেমন বাসু যখন বলে-আমি এক সময় ফাইভ ষ্টার হোটেলে চাকরি করেছি; তখন ফ্ল্যাশব্যাকে দেখা যায় সে হোটেল বেয়ারার পোশাকে স্যুটকেস বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এই দৃশ্যায়নটা অবশ্যই চমৎকার, মূল বক্তব্যের পাশাপাশি দর্শককে একটা ‘রিলিফ’ দৃশ্যও উপহার দেন পরিচালক। আর এই একটা দৃশ্যেই বাসুর চরিত্র দর্শকের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়। ওপর চালাক মানুষরা সবসময় সুবিধা ভোগ করে। এই সিনেমার বাসুও তাই, দিব্যি সবাইকে তাক লাগানো কাজ করে আর বিভিন্ন ভাবে সবার কাছ থেকে সুবিধা নেয়। এভাবে সে তার বন্ধুকেও ঠকায়। সবচেয়ে মজার ব্যাপার তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার দৌড় বেশি না হলেও সে রাজারামের অফিসেই চাকরি যোগাড় করে ফেলে। এখানে সেই চিরাচরিত তোষামোদে গলে যায় প্রতিষ্ঠানের মালিক। এই তোষামোদকারীর নিয়োগ যে তার ব্যবসার জন্য ক্ষতিকর হয় শুধু তাই না এক সময় দেখা যায় তার দ্বিতীয় পক্ষের তরুণী স্ত্রীকেও সে কব্জা করে ফেলে। এমনকি সে এই প্রেমের অভিনয় শুধু মালিকের স্ত্রী নয় তার প্রথম পক্ষের মেয়ের সাথেও প্রেম চালিয়ে যায়।

রাজারাম যদিও বাসুর জন্য এক সময় দুশ্চিন্তায় ছিল ডিগ্রি না থাকায় সে চাকরি পাবে কিভাবে। তারপর অবাক হয়ে দেখে বাসু শুধু চাকরিই পায়নি, তার চেয়ে ওপরের পদ পেয়েছে। কাজের ফাইল-পত্র তার পড়ে থাকে কারণ সে কাজ জানে না। তবে জায়গা মত আবার সেই চালাকি, রাজারামকে সে গছিয়ে দেয় তার কাজগুলো করে দেয়ার জন্য। রাজারাম স্বভাবসুলভ লজ্জায় কাউকে না বলতে পারে না। তাকে তার প্রতিবেশিদের অনেক অতিরিক্ত আবদার রাখতে দেখা গেছে মুখ বুঁজে। অফিসে শুধু বাসুর না, অনেকের কাজই সে করে দেয় চক্ষুলজ্জায় পড়ে। তার মধ্যে আসলে সত্যবাদিতার বীজ বপন হয়ে আছে সেই ছোটবেলা থেকে। আমাদের বাল্যশিক্ষার সেই বই যেটাতে লেখা আছে, ‘সদা সত্য কথা বলিবে’। রাজারাম যে সেই বইয়ের কথা মনে করে সত্যবাদি যুধিষ্ঠির হওয়ার আশায় দিন গোনে তা না। এ কথা তার মজ্জায় ঢুকে গেছে, এবং এখন সেটা সংস্কারের মত সে পালন করে যায়।

তবে অপ্রিয় হলেও সত্য যে আমাদের এই সমাজে কোনো এক বিচিত্র কারণে অযোগ্য লোকেরই জয়-জয়কার হয়। হয়ত তারা তাদের অদক্ষতাকে ঢাকতে সদা ছল-চাতুরির চর্চা করে যায় বলে সেটা সম্ভব হয়ে ওঠে। বাসু তার সব রকমের চাতুরতা দিয়ে এক সময় সকলের প্রিয় পাত্র হয়ে ওঠে। তাদের বাসস্থানের সবার মুখেই বাসুর নাম। এমনকি দেখা যায় সে মন জয় করে নিয়েছে রাজারামের স্বপ্নের রাজকণ্যা সন্ধ্যার। রাজারাম তাকে বহুবার নিজের মনের কথা বলার চেষ্টা করেছে। কিন্তু তার সেই লাজুক স্বভাব তাকে বারবারই বাধা দিয়েছে। বাসু সন্ধ্যার সাথেও প্রেমের অভিনয় করে। তার মন ভোলান কথায় সন্ধ্যার মত সরল মেয়ে প্রেমে পড়তে বাধ্য। তবে চলচ্চিত্রকার এটাও দেখিয়েছেন বেশির ভাগ মানুষ সাধাসিধে। তারা চতুর মানুষের ছলনা সহসা ধরতে পারে না। যখন বুঝতে পারে তখন সর্বনাশ যা হওয়ার তা হয়ে যায়। সন্ধ্যাও হয়ে যায় এই ধোঁকাবাজির শিকার। তবে এই সিনেমার কাহিনী গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে শেষ হয়েছে। দুষ্টের দমন এবং সত্যের জয় এই বহু ব্যবহৃত পরিসমাপ্তি হয় না এখানে। যদিও এই সিনেমার কথকের ভূমিকায় দাদী তাঁর নাতিকে যে গল্প বলেন তাতে কচ্ছপেরই জয় হয়। তবে সিনেমার গল্পকে আরও বাস্তব সম্মত পরিসামাপ্তি দিয়েছেন পরানজাপি।

বাসু রূপে ফারুক শেখ এখানকার পাঠ চুকিয়ে সবাইকে ফাঁকি দিয়ে চলে যায়। তার তেমন কোন শাস্তিও হয় না। বরং সে আরও একটা বড় দাঁও মারার সুযোগ বাগিয়ে ফেলে। সন্ধ্যার যখন আত্মহত্যা ছাড়া গতি নেই তখন রাজারাম তার দিকে ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দেয়। সততা, ভালোবাসা আর দায়িত্ববোধের জন্যই রাজারামকে এখানে প্রকৃত মানুষ মনে হয়। তাই বঞ্চিত রাজারামই আমাদের মাঝে আশা জাগায়- সকলেই আমরা পঁচে যাইনি।

যাহোক, এই ছিল মোটামুটি চলচ্চিত্রের কাহিনী। এর দৃশ্যায়নে পরানজাপি কাহিনীর মেজাজের সাথে সাথে এগিয়েছেন। প্রথম যে অ্যানিমেশন দৃশ্য সেটাতে সেই পরিশ্রমী কচ্ছপ আর অলস কিন্তু চতুর খরগোশের গল্প। এই দৃশ্য চলচ্চিত্রটা সম্পর্কে একটা ভূমিকার অবতারণা বলা যায়। সেখান থেকে গল্পের কথক দাদীর ঘর। আর তা থেকে তাদের আবাসস্থল ‘‘চাল’’। এখানে বাস করে বিভিন্ন এলাকার, নানা পদের মানুষ। তাদের সবাইকে ক্রমান্বয়ে নিয়ে আসা হয় ক্যামেরার সামনে। সেটার মাধ্যমে তুলে ধরা হয় এই সমাজের একটা চালচিত্র। এই যে এক একটি চরিত্র ফ্রেমে আসে সেটাও ঘটনার সূত্র ধরে। যেমন একটা দৃশ্যের কথা ধরা যাক-রাজারাম চা বানাতে গিয়ে দেখে দুধ নেই। সে বের হয় কোন প্রতিবেশির কাছ থেকে দুধ ধার করতে। কেউ হয়তো দুধ শেষ করে ফেলেছে, কেউ আবার হয়তো চালাকি করে তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে। আর যেখানে দুধ পেল সেখানে নানা ফাই-ফরমাস করে ফিরতে ফিরতে লেগে যায় অনেক সময়। এমনি করে বসবাসরত অনেকগুলো পরিবারের সাথে পরিচয় হয়ে যায় দর্শকের। আবার আরেকটি দৃশ্য যেখানে বাসু এসে ঢোকে রাজারামের ডেরায়। তার সুন্দর চেহারা আর স্মার্ট কথাবার্তা পুরো বাড়িটাতে একটা সাড়া ফেলে দেয়। কাকে কি বলে পটাতে হবে তা তার নখদর্পণে। তার আগমনে সবার মধ্যে যে চাঞ্চল্য তৈরী হয় তা বোঝানোর জন্য একটা গানের দৃশ্য দেখানো হয়। গানটা অবশ্যই ‘‘সিচুয়েশনাল সঙ’’। এক জনের মুখ থেকে গানটা আরেক জনের মুখে যাওয়ার দৃশ্যায়নটি চমৎকার। আরেকটি দৃশ্যের উলে¬খ না করলেই নয়। রাজারামের বাবা-মা থাকেন গ্রামে। ছেলের চিঠি এসেছে টাকা দরকার জানিয়ে। যদিও রাজারামের মত ছেলে দরিদ্র মা-বাবাকে এমন সমস্যায় ফেলার কথা না। কিন্তু বলা বাহুল্য এটা ঘটে তার অবিবেচক অতিথি বাসুর খরচ মেটাতে গিয়ে। যাই হোক তারপর সে চিঠি পেয়ে বাবা-মা দুশ্চিন্তায় পড়ে। টানাটানির সংসারে হঠাৎ টাকার সংস্থান করা যায় না। বাবার চোখের দৃষ্টি ধরে ক্যামেরা চলে যায় গোয়ালে বেঁধে রাখা গরুটার ওপরে। আর কিছুই বলে না কেউ, কিন্তু দৃশ্যটা দিয়ে পুরো পরিস্থিতিই বোঝানো হয়ে যায়। এরকম আরো কয়েকটা ছোট ছোট দৃশ্যায়ন আছে যা চলচিত্রকে সমৃদ্ধ করেছে।

অভিনয় করার সময় মাত্রা জ্ঞান যে কতখানি দরকারি তা এই সিনেমা দেখলে বোঝা যায়। পরিচালকের এক মস্ত কৃতিত্ব যে প্রতিটি চরিত্রকে তিনি নিজস্ব মাত্রার মধ্যে রেখেছেন। সমস্ত সিনেমায় নাসির উদ্দিন শাহ্কে একবারের জন্যও মনে হয় না তিনি রাজারাম যোশি নন। তাঁর এই চরিত্রের সাথে মিশে যাওয়ার অভিনয় না দেখলে সে কথা বোঝা যাবে না। সাই পরানজাপি তাঁর চলচিত্রে প্রত্যেকটি চরিত্র গড়েছেন নিপুন ভাবে। ছোট একটা চরিত্রও তাঁর কাছে সমান গুরুত্ব পেয়েছে। আর এই কারণেই একে ভালো চলচ্চিত্রের সংজ্ঞায় ফেলা যায়।

১৯৮৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘‘কথা’’ নামের এই হিন্দি ছবিটি ১৪১ মিনিটের। এই রঙিন সিনেমার সাউন্ড ‘‘মনো’’। এতে মূল চরিত্র নাসির উদ্দিন শাহের বিপরীতে সন্ধ্যার ভূমিকায় অভিনয় করেছেন দীপ্তি নাভাল। এতে ফারুক শেখ ছাড়াও আরও অভিনয় করেছেন জালাল আগা, টিনু আনন্দ, সুধা চোপরা প্রমুখ। আর দাদীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন লীলা মিশ্র।

© 2016. www.oncinemabd.com | Editor & Founder Bidhan Rebeiro | oncinemabd@gmail.com | C: www.bidhanrebeiro.wordpress.com