বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও মধ্যবিত্তের মাদ্রাসা

তত্ত্ব

সুমন রহমান

মাদ্রাসা থেকে ছুটিতে বাড়ি ফেরার পথে গ্রামের মেলা থেকে আনু তার ছোট্ট বোনটির জন্য একটা মাটির ময়নাপাখি কেনে। খেলনাটি সে বোনকে দেয় লুকিয়ে, এই দেহাতি জিনিসটা আনুর বাবার শরিয়তি অনুমোদন পাবে না বলে। আনুর বোন, যে কিনা এর কিছুদিন পরেই জ্বরে ভূগে মারা যাবে, মাটির ময়নাটাকে এমন এক জায়গায় লুকিয়ে রাখে যাতে সেটা কোনোদিনই বাবার চোখের বা হাতের নাগালে না আসে। এর কিছুদিন পর উনিশশো একাত্তর। গ্রামে গ্রামে হামলা চালায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। আনুর বাবার ইসলামী কৌমবিশ্বাসের নিকুচি করে পাকবাহিনী তছনছ করে আনুদের ঘরবাড়ি। সবকিছু লণ্ডভণ্ড , বিধ্বস্ত ঘরের মাঝে আনু খুঁজে পায় মৃত বোনের লুকিয়ে রাখা মাটির ময়নাটিকে। মাটির ময়না চলচ্চিত্রের এর আগের কাহিনী মাদ্রাসার, পরের কাহিনী মুক্তিযুদ্ধের। গ্রামের স্বচ্ছল হোমিওপ্যাথ ডাক্তারের ছেলে আনুর মাদ্রাসায় পড়তে যাওয়াটা যতটা না আর্থসামাজিক বাধ্যবাধকতা থেকে, তারচে বেশি অভিভাবকের ধর্মীয় বোঝাপড়ার ফল। ফলে, গোড়া থেকেই আনু আর রোকনের একযাত্রায় পৃথক ফলের সম্ভাবনা তৈরি হয়ে থাকে। আনু নয়, বরং তার অনাথদশা এবং জ্বিন-সংশ্লিষ্টতার কারণে আনুর বন্ধু রোকনই মাদ্রাসাছাত্রের আর্কিটাইপ। ছবির এই অংশে আমরা মাদ্রাসার জীবনের চিত্রায়ন দেখি, রোকনের বেড়ে ওঠা দেখি, পরিণতি দেখি, আসন্ন মুক্তিসংগ্রামকে সামনে রেখে মাদ্রাসার শিক্ষকদের নানারকম চিন্তা ও অ্যাক্টিভিজম দেখি। অন্য অংশে, আনুর চাচার মত তরুণদের হাত ধরে আনুদের গ্রামটি প্যান-ইসলামী স্বপ্নভঙ্গ ও জাতীয়তাবাদী সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য তৈরি হতে থাকে। এই দুই দশার মাঝখানে মাটির তৈরি একটি ময়নাকে এই ছবির রাজনীতির কেন্দ্রীয় সিগনিফায়ার হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন তারেক মাসুদ। যে কোন কার্যকরী প্রতীকব্যবস্থার মতই মাটির ময়না এই ছবির সেলুলয়েডে খুব সামান্যই জায়গা নিয়েছে। দুটো সিকুয়েন্সের কথা আগেই বলেছি, এর বাইরে কেবল আছে মমতাজের একটা গান “পাখিটা বন্দী আছে দেহের খাঁচায়”। এর বাইরে বাদবাকি ছবি মাদ্রাসাজীবনের উছিলায় মুক্তিযুদ্ধের, কিন্তু ছবির নাম মাটির ময়না। কেন? মাটির তৈরি ময়না পাখি কী সিগনিফাই করে স্বাধীনতা-পূর্ব বাঙলায়? বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই সিগনিফিকেশনের বাড়তি গুরুত্ব আছে কি? “মাটির ময়না” প্রতীক কি মাটির ময়না ছবিতে নির্মাতার শেখানো বুলিই আউড়ে যায়? নাকি ভিন্ন কিছুও বলে? পয়লা ইঙ্গিতটা হল, আনু মাটির ময়নাটা কেনে গ্রামের মেলা থেকে। অর্থাৎ মাটির ময়নাটা এল পার্বণ-ঘনিষ্ঠ কিন্তু অসাম্প্রদায়িক একটা প্রেক্ষাপট থেকে, দ্বিজাতিতত্ত্বের ঐতিহাসিক সমালোচনার রূপক হিসেবে। এই কারণেই আনুর গোঁড়া মুসলিম পিতার ভিটায় ময়না ঢুকেছে গোপনে, লুকিয়ে রাখা হয়েছে তাকে। এর বাইরেও, মাটির ময়না ছবিতে বাউলগান ও কবিগানের যে ছড়াছড়ি, তাতে বোঝা যায় তারেক মাসুদ বাউলধর্মকে অসাম্প্রদায়িক বাঙলার আরেকটা সিগনিফায়ার হিসেবে হাজির করেছেন। তার এই কৌশল মনে করিয়ে দেয় বঙ্গভঙ্গ-প্রেক্ষাপটে রবীন্দ্রনাথের উদ্যোগের কথা: যেভাবে তিনি বাউল সংস্কৃতিকে দুই বাঙলার ঐতিহাসিক ঐক্যের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন। মাঝখানে কেটে গেছে কমসে কম সত্তর বছর, তাই মাটির ময়নায় বাউল এসেছে অখ- বঙ্গের প্রতিনিধিরূপে নয়, পূর্ববঙ্গের বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদের সিগনিফায়ার হিসেবে। মেলায় কেনা ময়নাপাখিও তাই। গোপন স্বপ্নের মতই তাই এক ধর্মনিরূপিত রাষ্ট্রে তাকে লুকিয়ে থাকতে হয়েছে। সে প্রকাশ্য হয়েছে স্বপ্নভঙ্গের পর -- পাকবাহিনীর তছনছ করা ভিটাবাড়ি, হত্যাযজ্ঞ আর ধ্বংসলীলা যার রূপক। এভাবে, বাউলের “দেহের খাঁচায় বন্দী পাখি”কে ধর্মীয়-রাষ্ট্রের শৃঙ্খলে বন্দী সেক্যুলারিজমের প্রাণপাখির রূপকে বদলে দেন তারেক মাসুদ। এখন কথা হচ্ছে, ইতিহাসের এই পুনর্কথন কেন জরুরি মনে করছেন তারেক মাসুদ ২০০২ সালে এসে? সমসাময়িক বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মাটির ময়নার সাংস্কৃতিক রাজনীতিটুকু কি? এ বিষয়ে বলবার জন্য আমাদেরও একটু পেছনে তাকাতে হবে। বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী রাজনীতি দুইভাগে বিভক্ত, যথা: ভাষাভিত্তিক ও দেশভিত্তিক। বাঙালি জাতীয়তাবাদ শুধু যে ভাষাভিত্তিক জাতিসত্তা বিকাশের মতাদর্শ তা নয়, সামাজিক ন্যায়বিচার ও ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণা ঐতিহাসিকভাবেই এর মাঝে প্রোথিত। এই উদ্দীপনাটুকু নিয়েই প্রো-মস্কাইট কম্যুনিস্ট দলগুলো মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধকে তারা ‘জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব’ আকারে দেখেছে; শেখ মুজিবুর রহমানকে বুর্জোয়া সংগ্রামের নেতা মেনে। শেখ মুজিব তাদের এই অবদানকে স্বীকার করেছিলেন এবং ঐতিহাসিক-রাজনৈতিক কারণেই স্বাধীন বাংলাদেশ রূশ-বলয়ের একটি রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠতে শুরু করে। অবশ্য পঁচাত্তরের হত্যাকাণ্ডের পর সব হিসাব পাল্টে যায়। বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিপরীতে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ঝাণ্ডা তুলে ধরেন সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান। বাঙালি জাতীয়তাবাদ বললে বাঙালিত্ব প্রতিষ্ঠা পায় বটে, কিন্তু ভাষাগত ঐক্যের উছিলায় তা দেশের সীমানা ডিঙায়; আবার এই মতাদর্শ বাংলাদেশের অধিবাসী অবাঙালি ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোকেও তাত্ত্বিকভাবে বিপন্ন করে -- এই সমালোচনাকে ফোরফ্রন্টে রেখে যাত্রা শুরু হয় বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের। কিন্তু এ ছিল কেবল বহিরঙ্গের উছিলা। ভাষাভিত্তিক জাতীয়তা বিকাশের প্রশ্নটিকে দূরে সরিয়ে রাখার মাধ্যমে এই ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদ মূলত পুনর্বাসন দিল জাতীয়তার পুরনো সৈনিকদের, যারা পাকিস্তান-পর্বে ধর্মভিত্তিক জাতীয়তার খোয়াব দেখেছিলেন। জনগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য একটা অংশ এটা -- পুনর্বাসিত রাজাকার, রাজাকার-সমব্যথী, নব্যবলে বলীয়ান প্যান-এসলামী -- প্রায় সবটুকুই সমাজতন্ত্র-বিরোধী ও ভারত-বিদ্বেষী। সামরিক-শাসক জিয়াউর রহমান এদের একত্রিত করলেন তার বেসামরিক ছাতার নিচে। তখনও আওয়ামী লীগ সবচে বড় দল -- কিন্তু সেটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল উদ্যমহারা মুক্তিযোদ্ধা, স্বপ্নহারা সাম্যবাদী, দ্বিধাদীর্ণ মুসলমানদের জোট। বিপরীতে, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ পুঁজি করল পয়ষট্টি’র যুদ্ধের স্মৃতি দিয়ে লালিত পালিত ভারত-বিদ্বেষকে। তাদের প্রোপাগাণ্ডায় বাঙালি জাতীয়তাবাদ হয়ে উঠল সেই মতাদর্শ, যাকে সমর্থন দিলে দেশ ইণ্ডিয়ার কব্জায় চলে যাবে! ফলশ্রুতিতে, বাংলাদেশের ক্ষমতার রাজনীতি থেকে দীর্ঘদিন দূরে অবস্থান করতে হল বাঙালি জাতীয়তাবাদকে। মাটির ময়না চলচ্চিত্রের সাংস্কৃতিক রাজনীতি নিয়ে মন্তব্য করতে গেলে এই গীতটুকু গাওয়া দরকার। জাতীয়তাবাদের তাত্ত্বিক বিতর্ক শিক্ষিত মধ্য এবং উচ্চবর্গের মামলা। কিন্তু এর নিচে, বিস্তীর্ণ যে নিম্নবর্গীয় সমাজ, তারাও দুইভাগে বিভক্ত। কিন্তু সেই বিভক্তি জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের যতটা, তারচে অনেক বেশি হল বিদ্যমান আবহমান গোত্রীয় রেষারেষির। সেই ডায়ালেকটিকসে বাঙালি বা বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ বড় ইস্যু ছিল না। সেই না-ইস্যুকে জিয়াউর রহমান ও তার অনুসারীরা তৃণমূল পর্যায়ে সফলভাবে ইস্যু করে তুলতে সক্ষম হন, মসজিদে-মাদ্রাসায়-বাজারে বাঙালি জাতীয়তাবাদের জুজুর ভয় দেখিয়ে দেখিয়ে। বাঙালি ও মুসলমান পরিচয় পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে সেসব রাজনৈতিক প্রোপাগাণ্ডায়। এই জুজু শুধু সাধারণ মানুষকেই যে ভয় দেখিয়েছে এমন নয়, আতঙ্কিত এবং কিংকর্তব্যবিমুঢ় করে ফেলেছে খোদ আওয়ামী লীগকেও। বাঙালি জাতীয়তাবাদ যে ছোঁয়াচে রোগ নয়, জনগণকে তা বোঝানোর জন্য আওয়ামী লীগ জামাতসহ এমন অনেক রাজনৈতিক দলের সাথে ‘কৌশলগত’ জোট করেছে। “জঙ্গীবাদ” মোকাবেলায় সে যতটুকু দোনোমনা করেছে, পরবর্তীতে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে বিএনপি তার একাংশও করেনি। রাজনীতিতে পীরতন্ত্র আওয়ামী আমলে দাপটের সাথেই অবস্থান করেছে। এসবই পূর্বতন প্রোপাগাণ্ডায় সেক্যুলার বাঙালি জাতীয়তাবাদের নিরতিশয় কাহিল চেহারা। এই প্রেক্ষিতে, মাটির ময়না মূলত বাঙালি জাতীয়তাবাদেরই একটি সাংস্কৃতিক প্রকল্প, যা মাদ্রাসা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের একটি পুনর্কথন তৈরি করার মাধ্যমে সেই দায়িত্বটি পালনের চেষ্টা করছে -- সত্তর দশকের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ-বাকশাল সরকার যার তোয়াক্কা করে নি, আশি-র রাজপথে থাকা আওয়ামী লীগ যা নিয়ে ভাবে নি, নব্বইয়ের বিমূঢ় বিরোধী দল আওয়ামী লীগ যে বিষয়ে ভেবে কুলকিনারা পায় নি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, মাটির ময়নার এই সাংস্কৃতিক রাজনীতি কিন্তু বিএনপি-জামাত সরকার ঠিকই টের পেয়েছিল এবং ফলশ্রুতিতে সেন্সরবোর্ডের ছাড় পেতে একে বিস্তর ঝামেলাও পোহাতে হয়। সেই অর্থে, মাটির ময়না যতটা না বাঙালি জাতীয়তাবাদের ছবি, বা মুক্তিযুদ্ধের ছবি -- মাদ্রাসার ছবি ততখানি নয়। মাদ্রাসা এখানে একটি কৌশলমাত্র, যা দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদকে তার ঐতিহাসিক সমালোচনাগুলোর বিরূদ্ধে জয়যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। আনু মাদ্রাসার অবধারিত ছাত্রগোষ্ঠীর প্রতিনিধি নয়, ফলে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের জীবনে তার ফিরে আসার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু থাকে না রোকন কিংবা অন্যদের। তারেক মাসুদ তার ছবিতে একজন পরিণত আনুর রোডম্যাপ এঁকেছেন, কিন্তু সন্ধান দেননি পরিণত রোকনের। আগেই বলেছি, আনুর মাদ্রাসা-প্রেক্ষিত তার সেক্যুলার বাঙালি জাতীয়তাবাদী হয়ে উঠতে তেমন কোনো বাধা তৈরি করে না। এর ফিল্মি কারণদুটো হল, সে তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছল পরিবারের সন্তান এবং প্রচুর সময় কাটিয়েছে তার মুক্তিযোদ্ধা-সমাজতন্ত্রী চাচার সান্নিধ্যে। মাদ্রাসার সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রতিনিধি রোকনের এই সুবিধাদুটোর কোনোটাই ছিল না। ফলে সে কিন্তু সেক্যুলার বাঙালি জাতীয়তাবাদের আওতার বাইরেই থেকে গেল। মাটির ময়না আমাদের কখনই জানায় না যে , জ্বিনটি রোকনের শরীর ছেড়ে গিয়েছিল কিনা? নাকি আত্মঘাতী বোমা হয়ে তার শরীরে লটকে গিয়েছিল বাদবাকি জীবনের জন্য?

© 2016. www.oncinemabd.com | Editor & Founder Bidhan Rebeiro | oncinemabd@gmail.com | C: www.bidhanrebeiro.wordpress.com