ব্যালট বিধি বিচ্ছিন্নতা

সিনেমা আলোচনা

আবুল খায়ের মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান

উনত্রিশ ডিসেম্বর সোমবার। নারিকেল জিঞ্জিরা থেকে তেঁতুলিয়া। সাত-সকালেই সেজেগুজে বেরিয়ে পড়বে সবাই। ঢল নামবে কেন্দ্রে কেন্দ্রে। শহরে-বন্দরে, গ্রামে-গঞ্জে চলবে সারাদিন। সন্ধ্যা থেকে শুরু হবে উৎকণ্ঠ অপেক্ষা। রাত ভোর হবে রেডিও টিভির সামনে। দেওয়ার যোগ্য হোক বা না হোক, দিক বা না দিক ভোটের দিনটি প্রায় সকলে এভাবেই কাটাবে। নির্বাচন এমনই উৎসবমুখর। তবে সবখানে নয়। ইরানের কিশ মরুদ্বীপের লোকেরা নির্বাচন দিনেও জানে না আজ ‘ভোট’। এই দ্বীপবাসীরা জানেই না প্রার্থী কারা, কিভাবে, কোথায় ভোট দিতে হবে। তাদের সবচেয়ে বড় অজানা ভোট দিয়ে কী হবে। কারো কাছে পুরো দ্বীপের অল্প কিছু লোক ছাড়া নির্বাচন কোন মানে বহন করে বলে মনে হয় না। এমন এক নিরাবেগ নিরুত্তাপ নির্বাচনের গল্প বাবাক পায়ামি পরিচালিত ‘সিক্রেট ব্যালট’ (২০০১) ছবিটি। ইরানের দক্ষিণে পারস্য উপসাগরের প্রত্যন্ত মরুদ্বীপ কিশ। সেখানে আজকের দিনটি আর পাঁচটি দিনের মত সাধারণ নয়। সমুদ্রতীরের পাহারাদার সৈনিক (সাইরাস আবিদি) ঘুম থেকে উঠে জানতে পারে আজ নির্বাচন। প্যারাসুটে করে আগেই ব্যালট বাক্স চলে এসেছে, নৌকায় করে আসে নির্বাচন কর্মকর্তা (নাসিম আবদি)। নির্দেশ: পুরোদিন নির্বাচনী কাজে সহযোগিতা করবে সৈনিক। নারী কর্মকর্তা দেখে প্রথমেই ধাক্কা খায় সৈনিক। সামরিক জিপে চড়ে দিনভর তারা দ্বীপের আনাচে কানাচে চষে বেড়ায়। যাত্রাপথে একের পর এক বিস্ময় উন্মোচিত হতে থাকে... দ্বীপের কেউ জানে না আজ ‘ভোট’। ভোটের নিয়মকানুন সম্পর্কেও জানে না অনেকে, অনেকে ভোট দিতে একেবারে অনাগ্রহী, আবার কেউ কেউ অত্যুৎসাহী। এমনই বিচিত্র ধরনের ভোটারের কাছ থেকে ভোট নেওয়ার জন্য কোন চেষ্টাই বাকি রাখেন না নির্বাচন কর্মকর্তা। দিনের শুরু হয় যেই দৃঢ় বিশ্বাস, আদর্শ, মূল্যবোধ দিয়ে, দিনশেষে তার অনেক কিছু ওলট-পালট হয়ে যায়। সূর্যাস্তের আগেই নির্বাচনী কর্মকর্তার আদর্শিক অবস্থান ধুলায় লুটিয়ে পড়ে। অন্যদিকে নিঃসঙ্গ সৈনিকের হৃদয়ের গোপন ভোটটিও এরই মধ্যে চুরি হয়ে যায়। ১ ভোরের আলো ফোটার আগেই প্রত্যন্ত মরুদ্বীপে ব্যালট বাক্স ফেলতে আসা সশব্দ সামরিক বিমান জনমানুষের জীবনে রাষ্ট্রের আগমন জানান দিয়ে যায়। এরপর আসে যন্ত্রচালিত নৌকা আর তাতে করে এসে দ্বীপে নামে নির্বাচন কর্মকর্তা। সামরিক জিপে করে দ্বীপবাসীর দ্বারে দ্বারে গিয়ে সারাদিন ভোট সংগ্রহের পর যখন ফিরে যাবার সময় হয়, তখনকার আয়োজন আরো বেশি। কর্মকর্তাকে নিতে সেই দ্বীপে সাক্ষাৎ এক উড়োজাহাজ এসে হাজির। কিছুক্ষণ আগেই প্রতিশ্রুতিমত নৌকা না আসায় রাষ্ট্রের দায়িত্বহীনতার যে আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল, তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়। এতে করে (সিনেমায়) অন্তত তিনটি উদ্দেশ্য হাসিল করে রাষ্ট্র। নির্বাচনের গুরুত্ব সম্পর্কে নাগরিকদের আরেকবার সচেতন করার পাশাপাশি নিজের দায়িত্বশীলতা ও সদম্ভ উপস্থিতিও জানিয়ে যায়। রাষ্ট্রের এমন ঢোলপেটানো স্বভাব ইরানি সিনেমার বা ইরানের বিষয় মাত্র নয়। নির্বাচনের মাধ্যমে জীবন সাজাবার প্রয়োজনে না হলেও জীবন বাঁচাবার আরো বড় প্রয়োজনে এমন তুলকালাম বাংলাদেশেও সুপরিচিত। সিডর-বিধ্বস্ত এলাকায় মাত্র কয়েক শত বস্তা ত্রাণ নিয়ে যেতে হেলিকপ্টারের পিছনে শত শত কোটি টাকা অযথা খরচ করার উদ্দেশ্য যতটা না দ্রুত পৌঁছা তার থেকে বেশি আত্মপ্রচার এই কথা পাগলও বোঝে। তবুও যখন আসে, আসে জলপথে আর যায় আকাশপথে যে পথে জনমানুষের ছায়াও মারাতে হয় না! ফলে বেশির ভাগ সময় জনজীবনের বাইরেই থেকে যায় রাষ্ট্র এবং সরকার। প্রত্যন্ত একটি দ্বীপকে প্রেক্ষাপট হিসেবে নিয়ে পরিচালক সম্ভবত জনবিচ্ছিন্নতার এ বিষয়কেই ভিন্ন মাত্রা দিতে চেয়েছেন। ২ হালের দুনিয়ায় রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনার ‘আদর্শ’ ও সর্বাধিক প্রচলিত ব্যবস্থা নিঃসন্দেহে গণতন্ত্র। আর গণতন্ত্র প্রক্রিয়ার প্রধানতম অনুষঙ্গ নির্বাচন। তাই রাষ্ট্র, সরকার, প্রতিষ্ঠানের সাথে সাধারণ নাগরিকের যে বিচ্ছিন্নতা, যে দূরত্ব তা তুলে ধরতে বাবাক পায়ামি চতুরতার সাথে বিষয় হিসেবে নির্বাচনকেই নির্বাচন করেন। শত সহস্র পরিবর্তনের অঙ্গিকার নিয়ে আসে প্রতিটি নির্বাচন। বিগত জঘন্য দিন থেকে উত্তরণের জন্য নির্বাচন আসে ‘দিনবদলের’ সনদ হাতে। নিয়ে আসে দেশের, জাতির উন্নয়নের সনদ। মরতে বসলে দেশ ও দেশের মানুষকে ‘বাঁচাবার’ গালভরা বুলি নিয়েও আসে নির্বাচন। যেখানে রাজনৈতিক দল এমন প্রচারণায় নামে না সেখানেও নির্বাচন সফল করা চাই। ওখানে দায়িত্ব বর্তায় খোদ সরকারের উপর। তাই ভোট নিতে আসা কর্মকর্তাকে ভোটগ্রহণের পাশাপাশি ভোট দেওয়ার গুরুত্ব সম্পর্কেও বোঝাতে হয়। বোঝাতে হয় ভোটের মাধ্যমে এমন ব্যক্তিকে নির্বাচন কর যে তোমাদের সমস্যা বুঝবে, যার মাধ্যমে তোমাদের উন্নয়ন হবে। ভোট দিতে না চাইলে এমনকি জোরাজুরি পর্যন্ত করতে হয় তাকে। পশ্চিমের গণতান্ত্রিক দেশে কৈশোর-যৌবন কাটিয়ে নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে ভালভাবেই অবগত হয়েছেন পায়ামি। ছোট মুখে বড় করে বলতে, এসব প্রতিশ্রুতি আসলে গণতন্ত্রেরই বা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেরই প্রতিশ্রুতি। সিনেমায় তিনি এগুলো স্পষ্ট বলেছেন। তিনি হয়তো সেসব প্রত্যাশার অসারতা, অর্থহীনতা আর স্বপ্নভঙ্গেরও সাক্ষী ‘সিক্রেট ব্যালট’ দেখে এমন মনে হওয়া দোষের কিছু নয়। তিনি নানাভাবেই কখনো প্রকাশ্যে, কখনো বা অপ্রকাশ্যে রাষ্ট্র, গণতন্ত্র, নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। গণতন্ত্রের ‘পীঠস্থান’ থেকেও তিনি যদি এমনতর অভিজ্ঞতা লাভ করেন, তাহলে ইরানের অথবা বাংলাদেশের বাস্তবতা কত মধুর তা সহজেই বোঝা যায়। ভোট নেওয়াটাই, ভোট দেওয়াটাই বড় কথা। মোট ভোটারের একটা বড় অংশের ভোট না পড়লে সেই নির্বাচন জায়েজ হয় না। তাই ভোট নিতেই হবে, ভোট দিতেই হবে। মানুষ মারা যাক, শোকে কাতর থাক, কবরখানায় গিয়ে হলেও ভোট নিতে হবে। কারণ ব্যক্তিমানুষের চেয়ে দেশ বড়; শোকের চেয়ে নির্বাচন বড়। এই জায়গায় ছবিটি অনেকখানি অমানবিক হয়ে ওঠে। নির্বাচন কর্মকর্তার এই সাময়িক অমানবিকতা তার সরল সোজা আদর্শবাদের ফসল। প্রগতি, গণতন্ত্র আর সংস্কারের অবুঝ পতাকাবাহী সে। তার কাছে এগুলো প্রতিষ্ঠাই বড়, তা যেকোন মূল্যেই হোক; কেবল জবরদস্তি ছাড়া। সে তার আদর্শ প্রতিষ্ঠায় সহমর্মিতাহীন, বোঝাপড়াহীন। অন্যদিকে সৈনিক চরিত্রটি আপাত কাজকর্মহীন। জনমানবশূন্য সমুদ্র সৈকত এবং আশেপাশের এলাকায় অনুপস্থিত শত্র“ এখানে চোরাকারবারি তৈরি এবং তা নিধনেই তার মনোযোগ নিবদ্ধ। প্রধান এই চরিত্র দুটি দুই বিপরীত মেরুতে অবস্থান করলেও দুজনই রাষ্ট্রের প্রতিনিধি। তবে ভিন্ন দুই প্রতিষ্ঠানের। একাগ্রতার সাথে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দুজনই জনমানুষের সাথে প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র, সরকারের বিচ্ছিন্নতাকেই তুলে ধরে। পায়ামি নিজেও বলেছেন: ‘[এই] সনেমার বিষয়বস্তু একাকিত্ব, বিচ্ছিন্নতা, দূরত্ব, সমন্বয় প্রক্রিয়ার সমস্যা, বোঝাপড়া ও যোগাযোগের অভাব।’ ছবির এই বিষয়বস্তুকে জোরালো করার প্রয়োজনেই লং শট আর ব্রড ভিউয়ের অতিরিক্ত ব্যবহার আমরা লক্ষ্য করি। সামরিক জিপটিকেও সবসময় একটা বিশেষ দূরত্বে থামতে দেখি অন্য কোনে প্রয়োজনে নয়, কেবল সামরিক বাহিনী বা নির্বাচন কর্মকর্তার সাথে দূরত্ব বোঝানোর জন্যই। এ ধরনের শট দিয়ে দূরত্বের পাশাপাশি ধীরতা, সমগ্রতাও একই সাথে প্রকাশ করেছেন পরিচালক। ‘সিক্রেট ব্যালট’ শুরুই হয়েছে অগতিতে, শূন্যতায়। পায়ামি তাঁর প্রথম সিনেমাও শুরু করেছিলেন এমনই এক শূন্যতা থেকে: ‘ওয়ান মোর ডে’র (১৯৯৯) শুরু জনশূন্য বাসস্ট্যান্ডে। আরো ধীরলয়ে ৯ মিনিটের দীর্ঘ একটি শট দিয়ে শুরু হয় শেষ ছবি ‘সাইলেন্স বিটুইন টু থটস’ (২০০৩)। তিনটি মাত্র ছবিতেই বাজিমাত করেছেন বাবাক পায়ামি। সব ছবিতেই তাঁর অন্যতম মনোযোগের বিষয় একাকিত্ব আর বিচ্ছিন্নতা। সাথে আছে আবদ্ধ সমাজে অপরিচিত দুই নর-নারীর মধ্যে দ্রুত জমে ওঠা প্রীতিবোধ ও প্রেম। সব মিলিয়ে পায়ামির ছবিগুলোর মূলসুর একই। তারপরও প্রতিটি ছবি স্বাদে গন্ধে রূপে রঙে বিশিষ্ট। ৩ গণতন্ত্রকে খাট না করেও প্রচলিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ত্রুটিবিচ্যুতি সনাক্ত করেছেন বাবাক পায়ামি। নির্বাচন কর্মকর্তা আর সৈনিকের যত উদ্যোগ তা কেবল একটি ভাল নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রয়োজনেই। তবে প্রশ্ন থেকে যায়। পায়ামির সুরে সুর মিলিয়ে জানতে চাই: ভাল নির্বাচন হলেই যে ভাল একটি সরকার আসবে তার নিশ্চয়তা কোথায়? তখন একদিনের গণতন্ত্র করে পুরো পাঁচ পাঁচটি বছর (ইরানের জন্য চার বছর) কি পস্তাতে হবে না? পাইকারি দরে আন্তর্জাতিক জনপ্রিয় মতাদর্শ আমদানি করতে গিয়ে ব্যক্তি নাগরিকের প্রয়োজন, চাওয়া-পাওয়ার প্রতি মনোযোগ দেওয়া হয় না এই সমালোচনাও পায়ামির। ধরে নিলাম, ভাল নির্বাচনের পর একটি ভাল সরকারও আমরা পাব। কিন্তু সেই সরকারও কি বলতে পারে ব্যক্তি মানুষের চাওয়া পাওয়ার কী হবে? মানবিক প্রয়োজন, সমস্যার সমাধান কোথায়? এসবের উত্তর কে দেবে? সবকিছুর মত রাজনীতি, গণতন্ত্রও আজকাল ‘ডিজিটাল’ রূপ নিচ্ছে। সদ্য নির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এক্ষেত্রে বড় সাফল্যের পরিচয় দিয়েছেন। আমাদের এখানেও কোন কোন দলকে স্বল্প পরিসরে হলেও ডিজিটাল প্রচারে নামতে দেখা যাচ্ছে। ডিজিটাল গণতন্ত্র বিকাশের সাথে জনবিচ্ছিন্নতার সিনেমার প্রায় সব জায়গায়, ভোটারদের বোঝাতে, রাজি করাতে মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হয়। একটিমাত্র দৃশ্যে একটি ট্রাক ভোট দেওয়ার আশায় সামরিক জিপের পিছু নেয়। ধরতে পারার পর দেখা যায় একদল নারীকে নিয়ে এক লোক এসেছে ভোট দিতে। নারীদের সবার ভোট সে একাই দিয়ে দেবার দাবি করে। অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে তাকে শান্ত করা হয়। নারীরা যার ভোট সে নিজে দেওয়ার সুযোগ পায়। এমন চিত্র কি আমাদের দেশে খুবই অপরিচিত? কেউ বলে কয়ে অন্যের ভোট না দিলেও ভোট কারচুপির নজির এখানে একেবারে কম নয়। তাছাড়া সিনেমায় (এমনকি বাস্তবেও) অপরিচিত অযোগ্য প্রার্থীকে ভোট দিয়ে ফেলার আশঙ্কা তো থেকেই যায় যেখানে আগে থেকে কোন প্রচার প্রচারণা নেই, ভোট নিতে এসে নির্বাচন কর্মকর্তাই জানিয়ে দিচ্ছেন প্রার্থী সম্পর্কে! আমরা অবশ্য ভোট দিব পনের দিনে চেনা ব্যক্তিদের। ঠিক আছে, আমার ভোট না হয় আমি-ই দিলাম। আগের মত যাকে খুশি তাকে না দিয়ে বরং দেখে শুনে জেনেই দিলাম। আগের লাউয়ের বদলে কদুর চেয়ে বেশি কিছু কি পাব? সেই আশা করতে সাহস হয় না। সিক্রেট ব্যালটের সেই বৃদ্ধও হয়তো সে ভয়েই ভীত। কোন প্রার্থীকেই তার পছন্দ নয়, প্রার্থী হিসেবে তার একমাত্র পছন্দ ‘আল্লাহ’। একে ধর্মান্ধতা বলে উড়িয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। মানুষ যখন অসহায়ত্বের তলানিতে গিয়ে ঠেকে, তখনই অদৃষ্টবাদকে বেশি করে আঁকড়ে ধরে এ কথা হয়তো মিথ্যা নয়। সিনেমার প্রায় শেষাংশে রাস্তায় ট্রাফিক সিগনালের লালবাতি সিনেমার প্রধান টার্নিং পয়েন্ট। এখানে এসে সৈনিক গাড়ি থামিয়ে দেয়। দীর্ঘক্ষণ পরও লালবাতির সবুজ হওয়ার লক্ষণ দেখা যায় না। ওদিকে বেলাও পড়ে আসছে। পাঁচটার মধ্যে সমুদ্রতীরে পৌঁছতে না পারলে কর্মকর্তা ফিরে যেতে পারবে না, সারাদিন কষ্ট করে সংগ্রহ করা ভোট জলে যাবে। এমন এক পরিস্থিতিতে, আইনের প্রতি যে ব্যক্তি এত দায়িত্বশীল সে-ই কি না আইন ভাঙতে বলেন: “এই মরুভূমিতে আইন কোন মানেই রাখে না!...” নিজ প্রয়োজনে এভাবেই আইনের প্রয়োগকারীর কাছে, আইনের ধ্বজাধারীর কাছে আইন-কানুন, বিধি-বিধান অর্থহীন, অসার হয়ে ওঠে। এই দৃশ্য পায়ামির সবচেয়ে পছন্দের। এখানেই নির্বাচন কর্মকর্তা নিজের বিশ্বাসকে প্রশ্ন করতে থাকে, এখানেই সৈনিকটি এজেন্টের শেখানো পথে মূল্যবোধ, আদর্শ, আইনকানুনের পক্ষে কথা বলে। ৪ অনেক চলচ্চিত্র সমালোচক সিক্রেট ব্যালটকে অগণতান্ত্রিক ইরানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় প্রতিবন্ধকতার চিত্রায়ন বলে মন্তব্য করেছেন। কিন্তু এ বিষয়ে পরিচালকের বক্তব্য ভিন্ন। ইরানের কাহিনী হলেও এই সিনেমা ইরানের মাত্র নয়, পুরো দুনিয়াদারির সিনেমা। পায়ামি একটি বৈশ্বিক ছবি নির্মাণ করতে চেয়েছেন, কেবল ইরানের ছবি নয়। তাই এর ঘটনা পরম্পরা ইরানে সংঘটিত হলেও, ইরানের একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলের জনজীবনের নানা দিক উঠে আসলেও, এগুলো বিশ্ব বাস্তবতার অর্থই তৈরি করতে চায়। এই বক্তব্যের পক্ষে সিনেমার সঙ্গীতাংশকে প্রমাণ হিসেবে নেওয়া চলে। ইরানি সঙ্গীতের সাথে পাশ্চাত্য সঙ্গীতের যে ফিউশন সঙ্গীত পরিচালক মাইকেল গ্যালাসো তৈরি করেছেন তা অযথা নয়; যথার্থ ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। প্রযুক্তির সুযোগ-সুবিধা কম বা না থাকলেও ভাল ছবি তৈরি করা যায়। ইরান এর সবচেয়ে বড় ও বিস্ময়কর উদাহরণ। সিক্রেট ব্যালটও সেই সীমায় নির্মিত অসীম ছবি। একটি মাত্র ক্যামেরা, একটি মাত্র ট্রাইপড, চারটি লেন্স এই ছবির সম্বল। দুইটি রিফ্লেক্টর আর ক্রেন পুরো সময় অকেজোই পড়ে ছিল। কিন্তু ছবির গায়ে এসবর আচঁড় কোথায়? সিক্রেট ব্যালটের একই অঙ্গে অনেক রূপ। এই পথছবি একই সাথে সহজ সরল সামাজিক বয়ান; কাব্যিক ছবি। রূপ-রস সবদিক থেকেই সিনেমাটি ইরানি কবিতা বিশেষ আধুনিক কবিতা দ্বারা গভীর প্রভাবিত। মোহসেন মাখমালবাফ নির্মিত ‘টেস্টিং ডেমোক্রেসি’ পায়ামির এই ছবির অনুপ্রেরণা। এসব কথা খোদ পরিচালকের। বাবাক পায়ামির সিনেমায় প্রেম, প্রীতিবোধ ফেলনা কিছু না, নিয়মিত বিষয়। ব্যবস্থার ত্রুটিই আসলে সৈনিক বা মানুষকে যন্ত্র করে। অমানুষ করে। কিন্তু এই অমানুষ মানুষের ভিতরেই মনুষ্যত্বের, প্রেম ভালবাসার আগুন ছাই-চাপা থাকে। হালকা মৃদুমন্দ বাতাসেই তা দাউদাউ জ্বলে ওঠে... সৈনিকের মনে প্রেমাগুন জ্বলতে পুরো একদিনও লাগেনি। পথযাত্রার মাঝেই তাকে আমরা নরম হতে দেখি। সিনেমার শেষাংশে সবার ভোট নেওয়া হয়ে গেলে তীরে ফিরে সৈনিকের ভোট নিতে যায় নির্বাচন কর্মকর্তা। তাকেই সৈনিক নিজের ভোট দিয়ে বসে সেই ভোট তার হৃদয় সিংহাসনের। তবে তার প্রেম বেশিদূর এগোবার পথ পায় না। কর্মকর্তাকে নিতে উড়োজাহাজ চলে আসে। সে চলে যায়। সিনেমা যেই অগতি দিয়ে শুরু হয়, শেষটাও সেই অগতিতেই। মাঝখানের সাময়িক গতি দ্বীপবাসীর মনে কিছু আশার সঞ্চার করে। সেই আশা যে পূরণ হবার নয়, তারও ইঙ্গিত স্পষ্টই বোঝা যায়। ‘আমি চিনি গো চিনি তোমারে ওগো বিদেশিনী’ এমন বিরহী কোন সুর বুকে নিয়ে নির্ঘুম রাত কাটাতে সমুদ্রতীরের বেঞ্চে গিয়ে বসে স্বপ্নভঙ্গ সৈন্য। সিনেমা শেষ হয়। যন্ত্রসঙ্গীতের সাথে পাঁচ মিনিট ধরে সিনেমার ক্রেডিট লাইন উঠতে থাকে। কিন্তু আমরা উঠতে পারি না... সৈনিকের বিরহ আমাদের মনেও না জানি কোন বিদেশিনীর বিরহকাতরতা জাগিয়ে স্তব্ধ করে দিয়ে যায়! ................... ঢাকা ॥ ২৩ ডিসেম্বর ২০০৮। * কৃতজ্ঞতা: ঢাকা চলচ্চিত্র সভা পাঠচক্র অথবা তুষার, আজাদ, তানজু, শিশির ভাইসকল; সলিমুল্লাহ খান, জিয়াউর রহমান, ফাহমিদুল হক এবং শহিদুর রহমান। ** রচনাটি সাপ্তাহিক কাগজ কর্তৃপক্ষের ফরমায়েশ; ঐ পত্রিকার নতুন রূপে ও নবতর মেজাজে ১ম বর্ষ ৪র্থ সংখ্যায় (১১ জানুয়ারি ২০০৯), প্রথম প্রকাশিত। শিরোনাম ছিল ‘ভোট: রাষ্ট্রের উপস্থিতি আর বিচ্ছিন্নতা’। বর্তমান সংস্করণে আগের অনেক ভুলত্রুটি সংশোধন, পরিমার্জনা এবং কিছু ক্ষেত্রে বক্তব্যের সম্প্রসারণ করা হল।

© 2016. www.oncinemabd.com | Editor & Founder Bidhan Rebeiro | oncinemabd@gmail.com | C: www.bidhanrebeiro.wordpress.com