মেহেরজান: যুদ্ধকে ভালো না বাসার একটি গল্প

সিনেমা আলোচনা

পুন্নি কবীর

Imageনতুন চলচ্চিত্রকারকে স্বাগত জানানোর অভিপ্রায় নিয়েই মেহেরজান দেখা। হতাশ যে হলাম তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছুই নেই, কারণ বাংলাদেশী চলচিত্র আমাদেরকে বারবার এই বোধটারই মুখোমুখি এনে দাঁড় করায়। কিন্তু শুধু হতাশা নয় বরং এ চলচ্চিত্র এমন কিছু আবেগের উদ্গীরণ করেছে যার অভিজ্ঞতা প্রেক্ষাগৃহে বসে এই প্রথম।
মুক্তিযুদ্ধ যেখানে চলচ্চিত্রের প¬ট সেখানে ইতিহাসের যথার্থ উপস্থাপনার আশা নিশ্চয়ই দুরাশা নয়। কিন্তু কিছু অপ্রতিনিধিত্বশীল ঘটনা ও অবাস্তব চরিত্রের সম্মিলন ঘটিয়ে একটি ইতিহাসভিত্তিক চলচ্চিত্র প্রদর্শন করাকে এককথায় চলচ্চিত্রকারের ধৃষ্টতা বলব। ‘একটি যুদ্ধ ও ভালোবাসার গল্প’ - মেহেরজান চলচ্চিত্রের মূল বিষয় বাঙালী কিশোরী মেহের ও পাকিস্তানি পলাতক সেনা ওয়াসিমের প্রেম, পাকিস্তানি আর্মি ক্যাম্পে নির্যাতিত হওয়া এক প্রতিবাদী নারী চরিত্র নীলার জীবনের ঘাত- প্রতিঘাত এবং গ্রামের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব খাজা সাহেবের নিজ গ্রামকে যুদ্ধ থেকে প্রতিহত করার আকূল প্রচেষ্টা।
এই লেখাটি যখন লিখ্ছি ততদিনে মেহেরজানকে নিয়ে তর্ক-বিতর্ক একেবারে তুঙ্গে। তবে পাকিস্তানি সেনার সাথে বাঙালী নারীর প্রেমের বিষয়টি অনেকক্ষেত্রে তর্কের মধ্যমনি হলেও আমার কাছে তা আপত্তিজনক মনে হয় নি। বরং একজন চলচ্চিত্রকার যদি কোন নতুনত্ব বা ‘চমক’ দেখিয়ে দর্শককে প্রেক্ষাগৃহে টানতে চান তবে তাতে আমি দোষের কিছু দেখি না। হাজার হাজার বর্বর পাকিস্তানী সেনার মধ্যে যে দুই-একজন শান্তিকামী সেনা থাকতেই পারে না তা হলফ করে বলা যায় না। আর মানবতাই যেখানে সবচেয়ে বড় ধর্ম সেখানে কোন বাঙালী নারী এমন এক সেনার প্রেমে পড়তেই পারে। কিন্তু পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী যে অত্যাচার, ধ্বংস, হত্যা আর ধর্ষণের লীলাখেলায় মেতে উঠেছিল তার চিত্র কোথায়? তাদের নির্যাতনের প্রতিনিধি হিসেবে কি নীলার ধর্ষিত হওয়ার ঘটনাকে মেনে নেব যে কিনা আগেও বাঙালী পুরুষের হাতে সম্ভ্রম হারিয়েছে বলে পাকিস্তানি ও বাঙালী পুরুষকে একই চোখে দেখে এবং পুরুষ দৃষ্টিকে আনন্দ দেবার মত খোলামেলা পোশাকে নিজেকে উপাস্থাপন করে? পরিচালক রুবাইয়াত হোসেন তাঁর ২৬ জানুয়ারিতে প্রথম আলোতে প্রকাশিত কলামে নীলা চরিত্রটিকে ‘আগাগোড়াই যুদ্ধংদেহী ও প্রতিবাদী’ হিসেবে দাবী করেছেন। যদি তাই হয় তবে খাজা সাহেব তার আর সুমনের বিয়েতে অসম্মতি প্রকাশ করায় সে আর দশটা বাঙালী নারীর মতই ‘আমার কি হবে’ বলে ওঠে কেন? এবং ‘যুদ্ধংদেহী’ এ নারী তখনই যুদ্ধে যাবার জন্য রওনা দেয় যখন সুমনের সাথে তার বিয়ের সকল সম্ভাবনাকে খাজা সাহেব নস্যাৎ করে দিলেন, তার আগে নয়।
লক্ষ লক্ষ মুক্তিযোদ্ধার আত্মত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে নির্মিত চলচ্চিত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের এমন দায়িত্বহীন, ভীরু ও বিয়েপাগল রূপে উপস্থাপন করাকে নিঃসন্দেহে ইতিহাসের বিকৃতি হিসেবে দাবি করা যায়। এ চলচ্চিত্রে যে তিনজন মুক্তিযোদ্ধাকে দেখানো হয়েছে তারা সকলেই যুদ্ধ যখন তুঙ্গে তখন বিয়ের ভাবনায় অস্থির। মেহেরের খালাতো ভাই, যে কিনা মায়ের বাধা উপেক্ষা করে যুদ্ধে চলে যায়, কিছুদিন পরেই যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে বলে যে সে মরতে চায় না এবং মেহেরকে বিয়ে করতে চায়। খাজা সাহেবের কাছে তার মেয়ে সালমাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিয়ে আরেক মুক্তিযোদ্ধা বলে যে সে যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত। আবার নীলার বিপরীতে সুমন নামক তথাকথিত ‘কমিউনিস্ট’ (যাকে যুদ্ধে যেতে অবশ্য দেখা যায় নি কখনও) সেও নীলাকে বিয়ে করার জন্য খাজা সাহেবের কাছে অনুমতি প্রর্থনা করে।
চলচ্চিত্রে নারীকে খোলামেলাভাবে উপস্থাপনের বাণিজ্যিক অভিপ্রায় থেকে নিজেকে সংযত করতেও ব্যর্থ হয়েছেন পরিচালক রুবাইয়াত হোসেন। বরং একটি তাৎপর্যহীন ও হাস্যকর চরিত্রে অভিনয় করে ছবিটিকে আরো খেলো করে প্রদর্শন করেছেন দর্শকের সামনে।
এতকিছুর পরও চলচ্চিত্রের ডিটেইল নিয়ে সমালোচনা করা নিশ্চয়ই বাহুল্য। কিন্তু একজন চলচ্চিত্র প্রেমী হিসেবে সে সম্পর্কে দু-চার কথা বলা থেকে আমিও নিজেকে সংযত করতে পারছি না। প্রথমেই যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের এমন ঝকঝকে গ্রাম (না কোন বাগান?) দেখে খটকা লাগে। যুদ্ধের কারণে ঢাকা থেকে পালিয়ে নানাবাড়িতে আশ্রয় নেয়া মেহেরের পোশাক দেখে মনে হয় যুদ্ধ উপলক্ষেই সে যেন শত-শত পোশাক বানিয়ে নিয়ে এসেছে। মেহেরজানের প্রাপ্তবয়স্ক চরিত্রে জয়া বচ্চনকে আমরা ভাস্কর হিসেবে আবিষ্কার করি। কিন্তু তার কোন লক্ষণই কিশোরী মেহেরের চরিত্রে দেখা যায় নি। আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করলাম যে গ্রামের লোকজনের কোন নির্দিষ্ট ডায়ালেক্ট নেই। সেই সাথে আরো অবাক হয়ে দেখলাম যে ইংলিশ মিডিয়ামের হাল ফ্যাশানের ছেলে-মেয়েদের মতই আড়ষ্ট বাংলায় কথা বলছে সালমা। ভিক্টর ব্যানার্জী ও জয়া বচ্চন ছাড়া বাকী কলাকুশলীদের অভিনয়কে এককথায় দুর্বল হিসেবে অভিহিত করব, এবং এর দায়ভার পরিচালকের ঘাড়েই বর্তায় কারণ তিনি হুমায়ুন ফরীদি, আজাদ আবুল কালাম, শর্মিলী আহমেদ, খায়রুল আলম সবুজ, শতাব্দী ওয়াদুদ প্রমুখের মত শক্তিশালী অভিনয় শিল্পীদের ব্যবহার করার সুযোগ হাতছাড়া করেছেন। সেই সাথে বারবার অসঙ্গতিপূর্ণ এবং তাৎপর্যহীন বিভিন্ন দৃশ্যের অবতারণা ঘটিয়ে মেহেরজানের ন্যারেটিভ দর্শক হিসেবে আমাকে গল্পের মধ্যে প্রবেশ করতেই দেয় নি।
গল্পের মূল বিষয় মেহের আর ওয়াসিমের প্রেম হলেও খাজা সাহেবের চরিত্র ছিল পুরো চলচ্চিত্রের প্রাণ। খাজা সাহেবের চরিত্রে ভিক্টর ব্যাণার্জীর অভিনয় অবশ্যই অভিনন্দন জানানোর মত। কিন্তু চরিত্রটি যেমন স্ববিরোধী তেমনি দর্শকের মধ্যেও বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে। খাজা সাহেবকে আমরা দেখি যে তিনি একইসাথে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের পক্ষপাতী নন আবার অন্যদিকে বাঙালী জাতির অধিকারের প্রতি সচেতন। একদিকে তিনি গ্রামকে যুদ্ধ ও রক্তপাত থেকে বাঁচিয়ে রাখার কথা বলেন আবার মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার-দাবার দিয়ে সহযোগিতাও করেন। ফলে এ চরিত্রটির প্রতি দর্শক ঠিক কোন্ ধরনের মনোভাব পোষণ করবেন তা নিয়ে বিভ্রান্ত হন ফলে শেষে যখন তাঁকে হত্যা করা হয় তা আবেগকে নাড়া দেয় না।
যে চলচ্চিত্রকে মুক্তিযুদ্ধ ও ভালবাসার মত দুটো বিষয়কে একত্রিত করা হল তা কোনভাবেই মর্মস্পর্শী হল না, ব্যাপারটি দুর্ভাগ্যজনক। এ প্রসঙ্গে বলে রাখি য়ে বাঙালী জাতির মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাঁথাকে ভালোবাসা ও এর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের প্রতি জোর দেওয়া মানেই এই নয় যে মোহাবিষ্ট ও আবেগতাড়িত হয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে হবে । বরং মুক্তিযুদ্ধের প্রতি আপামর জনগণের আবেগকে পুঁজি করে যে দেশে নিত্য নতুন ব্যবসার অবতারণা হয় সেখানে কোন চলচ্চিত্রে যদি নির্মোহ ও নিরপেক্ষ তথ্য ও আধেয় উঠে আসে সেটা প্রশংসারই দাবিদার হবে ।কিন্তু মেহেরজানে সত্যের যে বিকৃত উপস্থাপনা দেখা যায় তা বরং মুক্তিযুদ্ধের বিপরীত পক্ষের প্রতি মোহকেই ইঙ্গিত করে ।
তবে ইতিবাচক বিষয় হল, মেহেরজানের মুক্তির ফলে যে পরিমাণে গঠনমূলক আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠেছে তা বাংলাদেশের দর্শকদের মধ্যেকার এক বিশাল গোষ্ঠীর সচেতনতাকে অধিকতর শক্তিশালী করতে জোরদার ভূমিকা রাখছে। ফলে ভষ্যিতে নির্মাতারা এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মানকে নেহাত ছেলেখেলা হিসেবে নেবেন না বলেই আশা রাখছি।

© 2016. www.oncinemabd.com | Editor & Founder Bidhan Rebeiro | oncinemabd@gmail.com | C: www.bidhanrebeiro.wordpress.com